বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি একটি নতুন শব্দের উদ্ভাবন করেছেন। সেটা হল সেফ এক্সিট। অর্থাৎ, নিরাপদে পালানোর রাস্তা। এখন প্রশ্ন হল, কে বা কারা পালাবেন, কোথা থেকে পালাবেন, কেনই বা পালাবেন? সম্প্রতি একাত্তর টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, সরকারের অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়ে সেফ এক্সিটের কথা ভাবতেছেন। তাঁর আরও দাবি, উপদেষ্টা পরিষদের অনেককেই বিশ্বাস করাটা ছিল বড় ভুল।
বাংলাদেশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছাত্রনেতার বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ পক্ষে আবার কেউ বিপক্ষে মন্তব্য করছেন। গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক দফা ঘোষণা করেছিলেন সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনকারীদের অন্যতম মুখ নাহিদ, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন। পরে তাঁরা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি গঠন করার পর নাহিদ উপদেষ্টা পদ ছেড়ে পাকাপাকি দলীয় পদে আসীন হন। অবশ্য ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে যোগ দেওয়া মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এখনও মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা রয়েছেন। যদিও সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, তাঁরা কেউ সরকারের উপদেষ্টা পদে যেতে চাননি। তাঁরা জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেটা হলে ছাত্রদের দায়িত্ব নিতে হতো না। তাঁর আরও দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখনও পর্যন্ত এই সরকারকে উৎখাত করার পাল্টা বিপ্লবের চেষ্টা চলছে। এই সরকারে যদি রাজনৈতিক শক্তি বা অভ্যুত্থানের শক্তি না থাকতো তাহলে অনেক আগেই সরকার পড়ে যেত।
নাহিদ ইসলামের সেফ এক্সিট বক্তব্য নিয়ে যদিও গোটা বাংলাদেশ তোলপাড়। কেউ কেউ বলছেন, নাহিদের গলায় স্পষ্ট হতাশা। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, এই সরকার আর বেশিদিন টিকবে না। ভোট পর্যন্ত সরকার টিকবে কিনা সন্দেহ। তাই উপদেষ্টা এবং ছাত্রনেতাদের মধ্যেও অনেকে সেফ এক্সিট বা নিরাপদ প্রস্থান খুঁজছেন। অনেকেই এই পরিকল্পনায় অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাইছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছেন, যারা এখন সমস্ত মঞ্চ আলো করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, গরমা-গরম ভাষণ দিচ্ছেন। তাঁরা ভিতর ভিতর বুঝতে পারছেন খেলা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে। খুব শীঘ্রই একটা ঝড় আসছে, আর সেই ঝড়ে উড়ে যাবেন বর্তমানে ক্ষমতাসীন পক্ষের লোকজন। এই ঝড়ের আশঙ্কায় মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর পার্ষদদের অনেকেই এখন পালানোর পথ খুঁজছেন বলে দাবি। এই আবহেই নাহিদের মন্তব্য সেই ঝড় আরও তীব্র করেছে। যদিও নাহিদের পর মুখ খুলেছেন আরেক এনসিপি নেতা তথা সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন,
কিছু উপদেষ্টার মধ্যে দেখা যাচ্ছে- তারা কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্বটা পালন করেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক্সিট নিতে পারলেই হলো। কিন্তু এত এত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালনে যদি উপদেষ্টারা ভয় করেন তাহলে তাদের এই দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন নেই। যারা এ ধরনের চিন্তা করেন, তাদের জন্য মৃত্যু ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নেই। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাক বাংলাদেশের মানুষ তাদের ধরবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, ইতিহাসের রায় খুবই নিষ্ঠুর। এর আগেও বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের সরকারের প্রধানরা খালি হাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তাঁরা আজও দেশে ফিরতে পারেননি। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও বিদেশের মাটিতে বসে লড়াই করে চলেছেন। রীতিমতো ভারতে বসে তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ কর্মী এবং জনগণকে উজ্জিবীত করে রাস্তায় নামিয়েছেন। কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মীরা রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন শহর কাঁপিয়ে মিছিল করছেন। আর সেই মিছিলের বহর দিন দিন বাড়ছে। ফলে উপদেষ্টারা বুঝতে পারছেন, অচিরেই আওয়ামী ঝড় এসে তাঁদের সমূলে উৎপাটন করে ছাড়বে।












Discussion about this post