বাংলাদেশের গালে বিরাশি সিক্কার চড় কষিয়ে দিল নেপাল। দেখিয়ে দিল গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা আর সদিচ্ছা থাকলে দেশের স্বার্থে অনেক কিছু করা যায়।
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। নেতৃত্ব দিয়েছিল জেন জি। একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল নেপালেও। সে দেশে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল তরুণ বিগ্রেড। দুটি দেশের একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশে নির্বাচন হল দেড় বছর বাদে। আর নেপালে নির্বাচন হল গণঅভ্যুত্থান হওয়ার ছ মাসের মাথায়। ফলাফলে দেখা গেল যে জেনজিদের আন্দোলনের কারণে নেপালে সরকার পতন হয়েছিল, তারাই ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। মজার বিষয় ওলিও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার কোনও না তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে না কোনও দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেল বাংলাদেশে। আমরা সকলেই জেনে গিয়েছি যে বাংলাদেশের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারে, তার জন্য দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দলের প্রতীক নির্বাচন কমিশন ফ্রিজড করে দেয়। ফলে, নির্বাচন হয়েছে এক তরফা। অন্তরীণ থাকা আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো সুস্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। সব কিছু আগে থেকে ঠিক করা ছিল। দরকার ছিল একটি সরকারি সিলমোহড়ের। নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সিলমোহড় আদায় করা হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি তারেক রহমানকে আওয়ামী লীগের ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগকে নিয়ে কিছু বলেননি। তবে জানিয়েছেন, তিনি কোনও রাজনৈতিকদলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষপাতী নন।
প্রশ্ন উঠছে, নেপালে যেটা হল, সেটা কি বাংলাদেশে সম্ভব ছিল না?
নেপালে অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসীন হন সুশিলা কার্কি। তাঁর আশ্বাস ছিল ছয় মাসের মধ্যে দেশে নির্বাচন হবে। তিনি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেবে। সুশিলা কার্কি তাঁর প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের সময় তিনি জেনজিদের এই আশ্বাসই দিয়েছিলেন। তাদের ফিরে যেতে বলেছিলেন পড়ার টেবিলে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নেপালে তদারকি সরকারে জেনজির কোনও প্রতিনিধি বা তারা কেউ ছিল না। বাংলাদেশে হয়েছে ঠিক উল্টো। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। আর তাঁর সরকারে ঢুকে পড়ে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন। আরও লজ্জাজনক ঘটনা হল তদারকি সরকার বিদায় নিলেও সেই সরকারে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা এখনও বেশ কয়েকটি পদ দখল করে রয়েছেন। তারা স্বেচ্ছায় সেই সব পদ ছেড়ে দেবেন বলে মনে করছে না রাজনৈতিকমহল। নেপালের জেন-জি দের সঙ্গে বাংলাদেশের জেন জিদের তফাৎ বিস্তর। নেপালের জেন-জি রা মব সন্ত্রাস কায়েম করেনি। তারা রাজনৈতিক দল করে দখলবাজির চেষ্টা করেনি। নেপালে অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দু-একদিন বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। তারপর পরিস্থিতি যথারীতি শান্ত হয়েছে। জীবন চলেছে আপন ছন্দে।
বাংলাদেশে গত ১৮ মাসে ধরে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছিল তা প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় বছর ধরে বাংলাদেশজুড়ে চলছে মবের রাজনীতি। নেপালের নির্বাচনে ধরা পড়ল ভিন্ন চিত্র। নেপালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে জেন জ়ি-দের (তরুণ প্রজন্ম) পছন্দের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। ওই দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তথা কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহ (‘বলেন’ নামে যিনি পরিচিত) ঝাপা-৫ আসনে হারিয়েছেন নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল-এর (ইউএমএল) প্রধান কেপি শর্মা ওলিকে। জেন জ়ির আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের জেরে গত ৯ সেপ্টেম্বের নেপালে পতন হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলির সরকারের।জেন জ়ির আন্দোলনে ওলি সরকারের পতনের পর দফায় দফায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের দাবিতে নেপালে আন্দোলন করেছে রাজেন্দ্র লিংডেনের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, তাদের ঝুলিতে আসতে পারে মাত্র একটি আসন। অন্য ছোট দলগুলি এবং নির্দল প্রার্থীরা মিলে ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’-এর প্রত্যক্ষ নির্বাচনে জিততে পারে আটটি আসনে।












Discussion about this post