বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পরিকাঠামোগত বেশ কয়েকটি প্রকল্প কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। এরমধ্যে বেশিরভাগই ছিল রেল প্রকল্প। মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে স্থগিত হয়ে যাওয়া ওই রেল প্রকল্পগুলি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ভারতের জন্য। মোদ্দা কথা, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রেলপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণ কেবলমাত্র সে দেশের রেল ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্যই নয়, ভারতের জন্যও ছিল বড় সুযোগ। কারণ এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্সকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল ভারত। নয়া দিল্লির উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ‘শিলিগুড়ি করিডোর’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। সেই লক্ষ্যে ভারতের তরফ থেকে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার রেল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম ছিল আখাউড়া-আগরতলা, খুলনা-মোংলা ও ঢাকা-জয়দেবপুর প্রকল্প। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় আসার পরই ভারতের সমস্ত রেল প্রকল্পই এথন বিশ বাও জলে। বলা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রেল প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছে ভারত সরকার। যার প্রভাব সে দেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। তা বলে ভারত সরকার, এই প্রকল্পগুলি নিয়ে চুপ করে বসে নেই। বিকল্প পথের সন্ধানও পেয়ে গিয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে, ভারত উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে রেলপথে দেশের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে ভারত। মূলত বাংলাদেশকে এড়িয়ে এই প্রকল্পের আওতায় নেপাল ও ভুটানকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। ভারতের মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে ক্রমাগত হুমকি আসছে বাংলাদেশ থেকে। এর পরই বিকল্প পথ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল নয়া দিল্লি। বর্তমানে, চারটি উত্তর-পূর্ব রাজ্য, আসাম, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ রেলপথে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত ছিলই। এখন মিজোরামও রেল মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। মিজোরামে ৫১.৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ভৈরাবি-সাইরাং লাইনটি সম্প্রতি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিল্লি ও কলকাতায় দুটি নতুন ট্রেনও চালু হয়েছে। কিন্তু ভারত সরকারের বরাবরের মাথাব্যাথা হল শিলিগুড়ি করিডোর। মাত্র ২২ কিলোমিটার সংকীর্ণ এই অংশে একটি রেললাইন ও একটি জাতীয় সড়ক রয়েছে। যার ভরসায় গোটা উত্তর পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ও মালপত্র আদানপ্রদান চলে। মোদি সরকার চাইছিল, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিয়ে কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত মালামাল পাঠানোর। এতে সময় কমে যেত অর্ধেকের বেশি। সেই কারণেই বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্ক ও রেললাইনের উন্নতিসাধন করছিল ভারত। কিন্তু ইউনূস সরকার এসে ওই প্রকল্পগুলি স্থগিত করে দেয়। কার্যত বাতিল হয়েছে তিনটি বড় রেল প্রকল্প এবং পাঁচটি সম্ভাব্য রুটের জরিপকাজ। যেমন, আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, ভারত সরকারের অনুদানে ১২.২৪ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথের ৬.৭৮ কিমি বাংলাদেশের অংশে অবস্থিত। খুলনা-মোংলা রেলপথ, প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প মোংলা বন্দরকে বাংলাদেশের প্রধান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল। এবং ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেলপথ সম্প্রসারণ, এর জন্য প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল ভারত।
এখন দেখে নেওয়া যাক, মোদি সরকার বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে কোন পথটি বেছে নিয়েছে। ভারত ও নেপালের মধ্যে জয়নগর-বিজলপুরা-বারদিবাস এবং যোগবাণী-বিরাটনগর ব্রডগেজ রেলপথের নির্মান কাজ শুরু হয়েছে। কেবলমাত্র ভারত সরকারের অনুদান সহায়তায় এগুলি তৈরি করা হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ থেকে নেপাল হয়ে এই রেলপথটি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে প্রবেশ করবে। ফলে এড়ানো যাবে শিলিগুড়ি করিডোরের ঝুঁকি। সেই সঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হবে।












Discussion about this post