মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ওসমান হাদি। এরপর না কি জুলাইয়ের পরিচিত মুখগুলিকে মুছে ফেলা হবে। প্রশ্ন উঠছে – এর পর কার পালা? হাসনাত-সারজিসরা কি বাংলাদেশে নিরাপদ? দেশের সামনে এখন জ্বলন্ত প্রশ্ন – গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার – বাক স্বাধীনতা ও ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার কি শুধুই খাতা-কলমে রয়ে যাবে? না কি এই অস্থির পরিস্থিতির সুযোগে একটি মহল তাদের নীল নকশা বাস্তবায়ন করে চলেছে ? জুলাই আন্দোলনের নেতাদের একে একে নীরব করে দেওয়ার যে মাস্টারপ্ল্যান চলছে বলে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেই আশঙ্কা কি ভিত্তিহীন? কী বার্তা দিচ্ছে হাদির মাথার গুলি?
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি এবং সামাজিক অঙ্গনে সব চেয়ে আলোচিত এবং নিঃসন্দেহে সব চেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হল হাদির ওপর বর্বরোচিত হামলা। ওসমান হাদি বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তাঁর শরীরে লেগে থাকা গুলি আর ঝড়ে যাওয়া রক্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার খেলাটা হয়তো কেবল শুরু হল। ওসমান হাদি একজন সাধারণ নাগরিক নন। তিনি জুলাই আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখ। একজন নেতা, যিনি সাহস করে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছিলেন। আর তাঁর এই পরিণতি কি অন্যদের জন্য শীতলবার্তা নয়? জনমনে এখন তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে – এর পর কার পালা?
এই আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন প্রবাসী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর বলেন, পরিচিত মহলে ২৫দিন আগে কয়েকজনের কাছে ওসমান হাদি এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কাফির নম্বর খুঁজছিল ফয়সাল। এরই মধ্যে হাদি গুলিবিদ্ধ হয়। আর এর পরে পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর চাউর হয়েছে যে, হাদির পরে সিরিয়ালে আছেন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কাফি। এই ধরনের গুঞ্জন বা সিরিয়াল টার্গেটের ধারণা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভিতি তৈরি করছে। যদি এই গুঞ্জন সত্য হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় জুলাই আন্দোলনের নেতাদের, যাঁরা জনগণের মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সচেতনতা তৈরি করছেন, তাঁদের একে একে সরিয়ে দেওয়ার এক সুদূর প্রসারী মাস্টারপ্ল্যান চলছে। এটা কি কেবল নেতাদের নিঃস্তব্ধ করে দেওয়া ? না কি এর লক্ষ্য আরও গভীরে? পুরো আন্দোলনকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায়।
এই হিংসাত্মক ঘটনা এবং টার্গেট করার বিষয়টি কিন্তু যথেষ্ট উদ্বেগের। এটি সরাসরি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বাক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানার সামিল। যে কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের নেতাদের ওপর আঘাত, তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে, যেভাবেই হোক না কেন, ভিন্ন মতের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর সেটা হলে প্রশ্ন উঠবে, দেশ কোনও ধরনের গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে? প্রশ্নটি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই ইঙ্গিত করে।
হাসনাত-সারজিসরা প্রকাশ্যেই তাদের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। হাদি-কাণ্ডের পর তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ওসমান হাদির পর এই নিশ্চয়তা কে দেবে যে হাসনাতদের দিকে কোনও বন্দুকের নল তাক করে রাখা নেই? তাঁদের মতো নেতারা, যাঁরা সমাজের চোখে আলো দেখানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের যদি এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এবং কর্তব্য একটি সরকার বা রাষ্ট্রের। এই ক্ষেত্রে জুলাই আন্দোলনের মতো সচেতনতামূলক কাজে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের যদি নিরাপত্তাহীনতার হুমকি থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের দায়িত্ব হবে ওই সব নেতাদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বন্দুক প্রস্তুত নয় – এই আশ্বাস কেবল সরকার বা রাষ্ট্রই দিতে পারে। সেটা দিতে ব্যর্থ হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। ঘটনা ঘটল এমন সময়ে যখন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। বড়ো থেকে ছোট – সব রাজনৈতিক দল শুরু করেছে প্রচার। আগামীদিনে হাদি কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটলে, সরকারের ব্যর্থতা আরও একবার প্রকট হয়ে ধরা দেবে।












Discussion about this post