বাংলাদেশের জমি ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যে মানবিক করিডোর দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা আপাতত নাকি স্থগিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান রাখাইন মানবিক করিডর নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। গত ২১ মে সেনাবাহিনীকে দেওয়া অফিসার্স অ্যাড্রেসে জেনারেল ওয়াকার বলেছিলেন, “নো ব্লাডি করিডোর”। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরফে এক সাংবাদিক বৈঠকেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোন আপোষ করবে না সেনাবাহিনী। অন্যদিকে বিএনপি সহ বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিও রাখাইন করিডোর নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিল। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে কিছুটা পিছু হটা হয়েছে এমনটাই দাবি। জাতিসংঘের আড়ালে এই রাখাইন করিডোর আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকে দেওয়া সামরিক ঘাঁটি হতে চলেছে এটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু আদৌ কি এই করিডর স্থগিত হয়েছে বা এই করেডার তৈরির কাজকর্ম বন্ধ হয়েছে? সূত্রের খবর হয়নি, বরং ইতিমধ্যেই জমি ও রুট চিহ্নিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থ ইস্ট নিউজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে রাখাইন করিডোরের কাজ এখনও চলছে। ইতিমধ্যেই ওই করিডোরের জন্য নির্দিষ্ট রুট চিহ্নিত করে জমি নেওয়ার কাজ চলছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান অধিদফতর বা ডিজিএমও সিলখালি এবং নাইক্ষংছড়ির মধ্যে ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পথ চিহ্নিত করেছে। যা ১০ম পদাতিক ডিভিশনের রামু সদর দফতরের খুব কাছে অবস্থিত। এই পথ দিয়েই মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে রাখাইন রাজ্যে সরবরাহ পাঠানো হবে। অর্থাৎ, নানা প্রতিরোধ ও বিতর্ক থাকলেও, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ এই রুট চিহ্নিতকরণ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত কৌশলগত পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর তৈরি করে খাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছে দেওয়া হবে স্বসস্ত্র বিদ্রোহী জনগোষ্ঠী আরাকান আর্মির কাছে। এই পরিকল্পনা নাকি জাতিসংঘের। এমনটাই দাবি করেছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু জাতিসংঘের আড়ালে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে সেটা বুঝতে বাকি ছিল না বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের। ফলে বাংলাদেশের তিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এই করিডোর দেওয়া নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান। এমনকি এই ধরণের কোনও করিডোর দেওয়া যাবে না বলেও জানিয়ে দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বিতর্কিত “মানবিক করিডোর” বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও দায়িত্ব দেওয়া হয়। যা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের মধ্যে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সেনাপ্রধানদের এত আপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাখাইন করিডোরের রুট চিহ্নিতকরণ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত কৌশলগত পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।
বিগত সময়ে অনেকগুলি ঘটনা ঘটে গেছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশসহ বেশ কিছুটা অংশ আরাকান আর্মির দখলে। যারা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করে চলেছে মিয়ানমারের সামরিক জুনটা শাসকদের বিরুদ্ধে। এখনো পর্যন্ত এই জুনটা শাসকরাই মায়ানমারের স্বীকৃত সরকার। হলে তাদের অন্ধকারে রেখে বাংলাদেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করে ফেলেছে। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ মিয়ানমার ইয়াঙ্গুনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আফতাব হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ফলে মিয়ানমারের শাসকরা যে এটা ভালোভাবে মেনে নিচ্ছে না, তা পরিষ্কার। এই মুহূর্তে মিয়ানমারের জুন্টা বাহিনীকে সমর্থন করছে চিন ও রাশিয়া। অপরদিকে বিদ্রোহী আরাকান আর্মিকে সাহায্য করতে চাইছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাঁদের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা। যাতে তাঁরা চিনের উপর নজরদারি চালাতে পারে। রাখাইন করিডোরের আড়ালে এই ঘাঁটি তৈরির অনুমতি দিতে চাইছে ইউনূস সরকার। ফলে অদ্ভুত এক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এটা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান, যিনি খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ট এই কাজে সাহায্য করছেন। এমনও জানা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত “মানবিক করিডোর” নিয়ে তীব্র দ্বিধাগ্রস্ত সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খান এবং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং খলিলুর রহমানের মধ্যে দুই ঘন্টাব্যাপী বৈঠক করেছেন ১৬ মে রাতে। তবুও অনড় মনোভাব নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কিন্তু সিলখালি থেকে নাইখংছড়ি রুট চিহ্নিতকরণে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলিমুল আমিন সহ পরিচালন ও পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যাদের মদত দিচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান। তাঁরাই দশম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর রামু মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শামলাপুর, বালুখালি, ঘুমধুম, উখিয়া হয়ে বান্দরবান জেলায় অবস্থিত নাইখংছড়ি পর্যন্ত রুট চিহ্নিত করে ফেলেছে প্রস্তাবিত রাখাইন করিডোরের জন্য। বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা মেরামতিও শুরু করেছে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বাংলাদেশে।












Discussion about this post