তদারকি সরকার প্রধান মহম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে হবে জাতীয় নির্বাচন। তার আগে বাংলাদেশ সাক্ষী রইল ছাত্র নির্বাচনের। সেই নির্বাচনে আত্মপ্রকাশ ঘটল তিন নতুন তারকার। এরা হলেন সাদিক কায়েম, এস এম ফরহাদ এবং মহিউদ্দিন খান। এই তিনের নাম এখন ক্যাম্পাস থেকে রাজপথে, আলোচনায় থেকে স্বপ্নে জায়গা করে নিয়েছে।
তবে তাদের এই আত্মপ্রকাশের পিছনে রয়েছে আত্মত্যাগ, জুলাই আন্দোলনের তাদের দৃঢ়তা, সেই সঙ্গে দূরদর্শী পরিকল্পনা। দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, ওয়ার্কশপ-সেমিনারের মধ্যে দিয়ে তারা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন জ্ঞানের ভাণ্ডার, অভিজ্ঞতার ঝুলি এবং সাহসী নেতৃত্বের মজবুত ভিত্তি। তিনের সাহস দেশজুড়ে চলা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। তৈরি করে এক নতুন ইতিহাস। নাহিদ-আসিফ-হাসনাত-সারজিসদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাদিক-ফরহাদ-জোনায়েদ-রিফাত জনতার আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে মানুষ রাস্তায় নামে। হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়। গণআন্দোলনের চাপে পড়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শুধু ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াননি। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এর মধ্যে সাদিকের রয়েছে সমন্বয় এবং ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা। চাপের মুহূর্তেও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ফরহাদ তুখোর বিতার্কিক। তাঁর সহজ-সোজা চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতা মানুষকে চুম্বকের মতো টানে। অন্যদিকে, মহিউদ্দিনের ব্যক্তিত্বে রয়েছে সারল্য এবং মেধার বিরল সমন্বয়।
ডাকসু নির্বাচনে তাদের বড় সাফল্য ইনক্লুসিভিটি। শিবিরের বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের প্যানেলে অন্তর্ভুক্তি থেকে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বী মেঘমল্লার বসু যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখন তাকে দেখতে যাওয়া অন্য বার্তা দিয়েছে। ভোটের ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিপদের সময় রাজনীতি দূরে সরিয়ে রাখাই সৌজন্য। প্রচারে তারা হাসিমুখে ছাত্র সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছে একতার বার্তা।
জাতীয় রাজনীতিতে আগামীদিনে এই তিন তরুণ নেতা যে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ তাদের পূর্ণাঙ্গভাবে চিনল খুব কম সময়ের মধ্যে। এখন থেকে অনেকেই বলছে, বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অভিমুখ এরা বদলে দেবে। আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন এই তিন মূর্তি। ভবিষ্যতে তারা জাতীয় রাজনীতিতে যে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত বছর আওয়ামী লীগের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একটি সভা ডেকেছিলেন। সেই সভায় তিনি প্রথমবারের মতো ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়নের পাশাপাশি ছাত্র শিবিরকে আমন্ত্রণ জানান। উপাচার্যের এই ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রদল এবং ছাত্র ইউনিয়ন। কারণ, তারা এবং সমমনোভাবাপন্ন দলগুলি সিদ্ধান্ত নেয়, কোনও অবস্থাতেই ছাত্র শিবিরকে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
জিয়ার আমলে ছাত্র শিবিরের আত্মপ্রকাশ। পরবর্তী সময়ে তারা ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে শুরু করে। ক্যাম্পাসে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। ছাত্র শিবিরকে কোণঠাসা করার কম চেষ্টা হয়নি। কিন্তু তাদের কোনওভাবেই দমিয়ে রাখা যায়নি। শেখ হাসিনার দেশ দশকের বেশি শাসনামলে ছাত্র শিবির কোথাও কোনও সভা করলে পুলিশ গিয়ে সেই সভা ভেঙে দিত। দলের নেতাদের গ্রেফতার করত। এমনকী জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগেও তাদের দলের বহু নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ল। আর ভোটের ফলাফল বুঝিয়ে দিল, বাংলাদেশ চাইছে পরিবর্তন।
তাদের এই জয় যে হাসিনা বা তাঁর দলের লোকেদের পছন্দ হবে না, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু পছন্দ না হলেও করার কিছু নেই। কারণ, ঢাকায় এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।












Discussion about this post