গত বছর ৫ই অগাষ্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে। তারপর থেকেই বিভিন্নভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মার্কিন ডিপ স্টেটের শিকার হয়েছেন। তাদের প্রস্তাব মেনে নিলে তাকে ক্ষমতা হারাতে হত না বলে বহুবার দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার এই অভিযোগের এক ধরণের সত্যতা দিলেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসাবে খ্যাত কবি, লেখক ফরহাদ মাজার। আমেরিকার ডিপ স্টেটের যে শেখ হাসিনা শিকার হয়েছেন, সেটার সমর্থন দিলেন। বেশ কিছু যুক্তি খাড়া করেছেন তিনি। জুলাই বিপ্লবকে নানাভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতৃত্বের বিচার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নানাভাবে বিপদেও পড়তে হতে পারে। আসলে হঠাৎ তিনি কেন এই ধরণের কথা বলতে গেলেন? উঠছে প্রশ্ন।
বাংলাদেশের কবি, লেখক ফরহাদ মাজার বাংলাদেশের এক সংবাদমাধ্যম সমকালে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বেশ কিছু বিষয়ে কথ বলেছেন। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কি তাহলে কথাতেই থেকে যাবে? উত্তরে তিনি বলেন, জনগণ ফ্যাসিস্ট নীতি, ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে। জনগণ নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য শহীদ হয়েছেন। এদের জীবনের কোনও মূল্য নেই। বিস্ময়করভাবে খোদ এই জনগণকেই নতুন এই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, এখানে সরকার শুধুমাত্র কথার কথা বলছে। যেখানে জনগণের সঙ্গে কিছু সম্পৃক্ততা নেই। তারপর তাকে প্রশ্ন করা হয়, জনগণ কি মত প্রকাশ করতে পারছে? নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে সক্ষম? তিনি বলেন, যখন মবের কারণে একের পর এক মাজার ভাঙ্গা হচ্ছিল, তখন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কবি, সাহিত্যিক, লেখকদের লেখার জন্য কারাগারে পাঠানো হল। অর্থাৎ একদিকে জনগণকে অস্বীকার, এবং তাদের দমন করা হল। আর অন্যদিকে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ার গণতান্ত্রিক অভিপ্রায় কে নস্যাৎ করে সংস্কারের নামে পুরনো ফ্যাসিস্ট সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার চেষ্টা দৃঢ়ভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান হয়ে গিয়েছে, মার্কিন সহায়তায় রেজিম চেঞ্জ। অর্থাৎ এখানেই তিনি স্বীকার করে নিলেন, এই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি একজন মার্কিন অর্থনীতিবিদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ওই অর্থনীতিবিদ ১৮ই আগস্ট দাবি করেছেন, পাকিস্তানের ইমরান খান সরকারকে যেভাবে পতন করানো হয়েছিল, ঠিক একইভাবে মার্কিন সহায়তায় বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে। তার সেই যুক্তিটাই এখন দেখছেন ফরহাদ মাজার। তারপরই তাকে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিভাবে বিচার করা হবে? আরেকটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতে শুরু করেছে। সেকুলার বাঙালি জাতি ফ্যাসিবাদের বিপরীতে বাংলাদেশকে ধর্মীয় জাতিবাদী ফ্যাসিবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় শক্তির উত্থানের কথা তিনি বলছেন। তিনি আরও বলেন, ভারতকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে তিনি সমঝোতা করতে পারবেন, সে বিশ্বাস রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ কোনও বিষয় যাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সমস্যাটা হল মার্কিন অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্কিন সহায়তায় বাংলাদেশের পট পরিবর্তন হয়েছে। সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে। এই পরিস্থিতিতে মহম্মদ ইউনূস ব্যর্থ হলে মার্কিন ডিপ স্টেটের তত্ত্বই সঠিক বলে বিবেচিত হবে।
তাকে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি হবে? তিনি বলেন, এতক্ষণ যা বললাম, তাতে আমাদের ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো হবে বলে মনে করছি না। এছাড়াও তিনি তার বক্তব্যে প্রায় স্বীকার করে নিয়েছেন, এখন যে সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার কথা বলছে সেই ৭২ সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অর্থাৎ ৭২ সংবিধানের জয় অবশ্যই।
এখানেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের যে উল্লাস লক্ষ্য করা যাচ্ছিল সরকারের অন্দরে, সেটা যে কোনও মুহূর্তে ম্লান হয়ে যেতে পারে। এখন দেখার, তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে কতটা গুরুত্ব বহন করে।












Discussion about this post