জেন-জি আন্দোলনের জেরে অগ্নিগর্ভ নেপালে ওলি সরকার পতনের পর, পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সামলেছে। এই পরিস্থিতিতে হিমালয়ের কোলে ছো্ট্ট পাহাড়ি দেশটির হাল ধরলেন ৭৩ বছরের এক মহিলা। যিনি একসময় নেপালের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনিই নেপালের ইতিহাসে প্রথম কোনও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নিলেন। নেপালের ওলি সরকারের পতনের চারদিন পর দেশটির দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিলেন সুশীলা কার্কি। নেপালের অন্তবর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই যিনি সম্প্রতি একটি মিডিয়া সাক্ষাৎকারে নিজেকে “ভারতের বন্ধু” হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। সুশীলা কার্কি ১৯৭৫ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ করেছিলেন। ফলে তিনি দীর্ঘদিন ভারতেই কাটিয়েছেন। এমনকি তাঁর জীবনসঙ্গী দুর্গা প্রসাদ সুবেদীর সঙ্গেও তাঁর বেনারসে প্রথম দেখা। সেই সময়, বারাণসী নেপালে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের এক অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সুশীলা কার্কি সেই আন্দোলনেও নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। অশান্ত নেপাল কার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াবে সে নিয়ে আলোচনা চলছিলই। এমনকি নেপালের অন্তর্বতী সরকারের প্রধান হিসাবে কে হবেন সেটা নিয়েও চলছিল জল্পনা-কল্পনা। প্রাথমিকভাবে কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহের নাম উঠছিল। বলা হচ্ছিল, বলেন্দ্রই জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। কিন্তু ‘জেন জি’-র তরফে তাঁর সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এরপরই নাম উঠে আসে বেণারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী, নেপালি সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নাম।
তাঁর নাম কার্যত নিশ্চিত হওয়ার পর বুধবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদও জানান কার্কি। তিনি বলেন, “মোদিকে আমি নমস্কার জানাই। আমি তাঁকে সম্মান করি। ভারতের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা এবং স্নেহ রয়েছে। কারণ, তারা সর্বদা নেপালের পাশে থেকেছে”। পাশাপাশি নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রথম লক্ষ্য থাকবে এই আন্দোলনে নিহত তরুণদের জন্য কিছু করা। তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। তিনি আরও বলেন, “নেপালে অনেক আগে থেকেই সমস্যা ছিল। এখন পরিস্থিতি আরও কঠিন। দেশের উন্নয়নের জন্য এক সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব আমরা। অপরদিকে, নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্ককে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তিনি সমাজমাধ্যমে শান্তির বার্তা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বগ্রহণের জন্য মাননীয়া সুশীলা কার্কিকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। নেপালের মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতির জন্য ভারত দৃঢ় ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’’। শপথের পরে সুশীলা কার্কিকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি জানিয়ে বলে, ‘‘ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, গণতন্ত্রের সহযোগী এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অংশীদার হিসাবে দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির স্বার্থে ভারত নেপালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত থাকবে‘‘।
জানা যায়. অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য জেন জি-র তরফে সুশীলা কার্কির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলে তিনি এই প্রস্তাবের পক্ষে অন্তত এক হাজার লিখিত স্বাক্ষর দাবি করেন। কিন্তু স্বাক্ষর উঠেছিল আড়াই হাজারের বেশি। ফলে “অত্যন্ত সৎ এবং যোগ্য নেত্রী” হিসেবে সুশীলা কার্কিকেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয় জেন-জি নেতৃত্ব। কূটনৈতিক মহল মনে করছেন, সুশীলা কার্কির আমলে নেপালের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব আরও মজবুত হবে। অন্যদিকে, ১৯৭৩ সালের ১০ জুন নেপালের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে সুশীলার স্বামী দুর্গা প্রসাদ সুবেদীর নাম ছিল বলে জানা যাচ্ছে। রাজা মহেন্দ্রের অধীনে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে “সশস্ত্র সংগ্রামের” জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য নেপালের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। নেপালি কংগ্রেসের তৎকালীন যুব নেতা দুর্গা প্রসাদ সুবেদীর নেতৃত্বে একটি দল বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন গিরিজা প্রসাদ কৈরালা, যিনি পরবর্তীতে নেপালের চারবারের প্রধানমন্ত্রী হন। সুশীলা কার্কির স্বামী-সহ বাকি অভিযুক্তরা একটি দ্বি-ইঞ্জিন নেপালী বিমান ছিনতাই করে, ভারতে প্রবেশ করে এবং প্রায় ৪ লক্ষ ডলার নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় দুর্গা প্রসাদ সুবেদী-সহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে ভারতের পুলিশ। এবং তাঁরা ভারতে জেলও খেটেছিলেন কয়েক বছর। তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ যাই থাকুন না কেন, আপাতত নেপালে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আপাতত ছ’মাসের জন্য দেশের সরকার চালাবেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী।












Discussion about this post