তারেক রহমান জয়ী হয়েছেন। দাঁড়িয়েছিলেন ঢাকা ১৭ আসনে। কেন্দ্রটি অত্যন্ত অভিজাত। জামাত ওই কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছিল খলিদুজ্জামানকে। তারেকের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান মাত্র সাড়ে চার হাজার। ফলে, তারেকের পরাজয় প্রায় কান ঘেঁসে বেরিয়ে গিয়েছে বলা যেতেই পারে। যখন জানা গেল তারেক রহমান ঢাকা ১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখন থেকে বাতাসে একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তারেক দলের চেয়ারপার্সন হওয়ার পরেও কেন একটা নিরাপদ কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না? দলের শীর্ষনেতারা সাধারণভাবে নিরাপদ কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য নয়। সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বলা হচ্ছিল, তারেক হেরে গেলে দল অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যেত। তার কারণ, জিয়ার প্রয়াণের পর দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তারেকের ওপর। তিনি হেরে গেলে নেতৃত্বে বড়ো ধরনের সংকট দেখা দিত।
এই ভোটে দুটি বিষয় সকলের নজর কেড়েছে। এক জামাতের রকেট গতিতে উত্থান, দ্বিতীয়ত তারেকের জয়। এখনও পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে জানা গিয়েছে, বিএনপি এবং তাঁর শরিকদল মিলে পেয়েছে ২১২টি আসন। জামায়াত জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। স্বতন্ত্র এবং অন্যরা পেয়েছেন সাতটি আসন। ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় ওই কেন্দ্রে ভোটদান স্থগিত রাখা হয়েছে। জামাত সরকার গঠন করতে পারছে না ঠিকই। কিন্তু তারা প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে। জামাত যে এই সাফল্য পাবে, সেটা অনেকেই আশা করতে পারেনি।
বাংলাদেশে যারা জামায়াতে ইসলামির ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, যাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন জামায়াতে ক্ষমতায় এলে অনেক কট্টরপন্থা গেঁড়ে বসতে পারে, তারা জামায়াতের পরাজয়ে খুশি। কিন্তু তারা দলটি নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখছেন না। জামায়াত পরাজিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বহু কেন্দ্রে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির প্রার্থীদের থেকে ভোটের ব্যবধান খুবই কম। ঢাকা ১৭ আসনের ফলাফল তার জ্বলন্ত প্রমাণ। জামায়াতে ইসলামিকে বাদ দিয়ে বিএনপি কোনওভাবেই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে জামায়াতে ইসলামি বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে সুযোগ পেয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে বিএনপি রাজপথের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে জামায়াত। এ দফাতেও বিএনপিকে পথ পরিষ্কার করে দিয়ে ক্ষমতায় আনার রাস্তা করে দিয়েছে জামায়াত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত পেয়েছিল মাত্র ১৮টি আসন। এখনও পর্যন্ত ভোটের যা ফলাফল, তাতে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত চারগুন আসন বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এর একটা অবসম্ভাবি প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত রাজনৈতিকমহল। আর ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জামাত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশে নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামাতের “রাজনৈতিক দল” হিসেবে স্বীকৃতি বাতিল করায় তৎকালীন বিএনপি প্রধান তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২২টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এত সংখ্যক আসন পেয়ে বিরোধী দল গঠন কার্যত বেনজির দৃষ্টান্ত। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামি, বিএনপি সহ চার দলীয় জোট নিরঙ্কুস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই সময় বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লিগ পেয়েছিল মাত্র ৬২টি আসন। আর ২০০৮ সালে চারদলীয় জোটকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। সেই সময় জামায়াত-বিএনপি জো ৩০টির মতো আসন পেয়েছিল। সেখানে এবারে ভোটে জামায়াতের ৭৪টি আসন নিশ্চিত। এই ফলাফল থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। আগামী পাঁচ বছর বিএনপিকে ফাঁক মাঠে খেলার সুযোগ দেবে না জামায়াত।












Discussion about this post