বাংলাদেশের সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পরই যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন, তাঁর নাম মোহম্মদ তাজুল ইসলাম। তাঁকেই ঢাকার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিচার করা এবং তাঁদের শাস্তি দিতে সবচেয়ে বেশি যিনি মরিয়া ছিলেন, তিনিই তাজুল ইসলাম। বিএনপি ক্ষমতায় এসেই তাঁকে সরিয়ে দিল। সোমবার বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রক থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে আনা হয়েছে আইনজীবী মহম্মদ আমিনুল ইসলামকে। ঢাকার এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালই পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। গত বছর ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার সাজা দেওয়ার জন্য তাজুল ইসলামই সবচেয়ে জোরালো সাওয়াল করেছিলেন। ক্ষমতা পরিবর্তনের পরই তাঁকে সরিয়ে অন্য আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়ার নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। প্রশ্ন উঠছে, তাজুলের এই অপসারণ কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
এটা কি নিচান্তই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীরতর রাজনৈতিক ইঙ্গিত। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিলেন। ৮ অগস্ট দায়িত্ব নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে তাজুলকে নিয়োগ করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকারিভাবে জানিয়ে দেওয়া হল, পরবর্তী নির্দেশ না-আসা পর্যন্ত ওই পদে থাকবেন আমিনুল। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের সমান পদমর্যাদা, বেতন এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা পাবেন। এই তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ছিল নানা অভিযোগ। তাঁর কেরিয়ারে জামাত যোগ অতি স্পষ্ট ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যে সমস্ত জামাত নেতা, তাঁদের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন এই তাজুল। অপরদিকে, নতুন চিফ প্রসিকিউটর আবার সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে বিচারমহলে অধিক পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলাগুলি হয়েছিল, আমিনুল সেই সমস্ত মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে লড়েছিলেন। ফলে তিনি যে বিএনপি ঘনিষ্ট তা আর বলে দিতে হবে না।
অপরদিকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পর তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দায়বদ্ধতা ছিল বাংলাদেশের ছাত্রজনতার প্রতি। তাঁরা যাতে প্রকৃত বিচার পায় সেটাই আমরা চাই।
এদিনে নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেন, আমরা চাই আইন অনুযায়ী এই ট্রাইবুনালটা পরিচালিত হোক। বিচার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ এবং গতিশীল হোক।
এখন প্রশ্ন উঠছে, হাসিনার বিরুদ্ধে যে বিচার হয়েছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সংস্থা ও বহু দেশ দাবি করেছে আসামী পক্ষকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনানো হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আবার পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লীগের কয়েকশো নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি মামলা হয়েছে। এটা নিয়ে বিএনপি সরকার কিছু ভাবছে কিনা। তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া যদি ইঙ্গিত হয়। তাহলে বিএনপি নেতা তথা বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই বিষয়ে অনেকটাই স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্যই বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এই পদক্ষেপ করেছে। তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ৫ অগস্টের পর বেশ কিছু মামলা হয়েছে, কিছু সুবিধাবাদী মানুষ সে সব মামলা করেছে। ব্যবসায়ী-সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের নামে মামলা করা হয়েছে। এ সব মামলা যাচাই-বাছাই করা হবে। কারণ, আমাদের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ হল, ইউনূসের আমলে দায়ের হওয়া মামলাগুলি এবার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বিএনপি সরকার।












Discussion about this post