ট্রাম্প ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে তোপ দেগেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদি তা ভালো চোখে দেখেননি। গত ১০ই আগস্ট তিনি ট্রাম্পের এহেন মন্তব্যের সমালোচনা করেন। জানান, ভারত বিশ্বের শীর্ষ তিনটি অর্থনীতির একটি হয়ে ওঠার দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প চাইছেন বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলি আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হোক। কিন্তু মোদি তাতে রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে। অন্যদিকে, দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি সম্ভব নয়, এমনটাও জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প।”জার্মান সংবাদপত্র ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালগেমাইনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন শোরগোল ফেলে দিয়েছে বিশ্বে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীকে ৪ বার ফোন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ফোন তোলেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এমন কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে, মোদী অপমানিত বোধ করেছেন।’ তবে জার্মান সংবাদপত্রের এই দাবি নিয়ে এখনও পর্যন্ত ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে কেন মোদী ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে রাজি হননি, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এক মার্কিন বিশেষজ্ঞ।
জার্মানির সংবাদপত্রে প্রতিবেদনে বর্তমান ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়গুলি নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ভারতের উপর চাপানো আমেরিকার ৫০ শতংশ ট্যারিফের উল্লেখও।
জার্মান সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে স্বাগত জানিয়ে তাঁকে ‘মহান নেতা’ বলে উল্লেখ করেন। ভারত এবং মার্কিন মুলুক একসঙ্গে যাত্রা করবে বলেও বড় বড় বুলি কপচান। কিন্তু কয়েকমাসের মধ্যেই তাঁর সুর বদলে গিয়েছে। ভারতকে ‘মৃত অর্থনীতির’ দেশ বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি ট্রাম্প। জার্মানির সংবাদপত্র ফ্র্যাঙ্কফুর্টার অ্যালজেমাইন একটি রিপোর্টে লিখেছে, ‘‘সম্প্রতি ট্রাম্প ফোনে চার বার মোদীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মোদী ফোন তোলেননি।’’ আবার, জাপানের পত্রিকা নিক্কেই এশিয়া-তে গত ২৪ অগস্ট দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি অনেক বার সমঝোতার জন্য ট্রাম্প মোদীকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী বার বার ফোন প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে ট্রাম্পের হতাশা আরও বেড়ে গিয়েছে। জাপানের ওই পত্রিকা ভারতীয় এক কূটনীতিবিদকে উল্লেখ করে এই তথ্য জানিয়েছে। এ নিয়ে ওয়াশিংটন বা নয়াদিল্লির তরফে কোনও মন্তব্য এখনও আসেনি, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাইছেন না মোদী? তার কারণও উল্লেখ করা হয়েছে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে। তাতে রয়েছে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ। গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত এবং পাকিস্তান যে সেনা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল, তা থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন ট্রাম্প। জানান, শুল্কের হুঁশিয়ারি দিয়ে যুদ্ধরত দুই দেশকে তিনি সংঘর্ষবিরতিতে রাজি করিয়েছেন। এই দাবি প্রথম থেকেই নয়াদিল্লি উড়িয়ে দিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ফোনে কথা বললে মোদীর সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে ট্রাম্প আবার যদি কোনও ‘ভুল ব্যাখ্যা’ করেন, সেই আশঙ্কায় তাঁর ফোন ধরতে চাইছেন না প্রধানমন্ত্রী। কিছু দিন আগে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তা নিয়েও মোদী অসন্তুষ্ট বলে দাবি।
একইসঙ্গে ভারতের উপর ৫০ শতাংশের শুল্কের বোঝাও চাপিয়েছেন। প্রসঙ্গত, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়ায় প্রথম দফায় ২৫ শতাংশ, পরে রাশিয়ার থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের উপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের দাবি, ভারতের তেল কেনার জন্যই রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ পাচ্ছে। যদিও ভারত আমেরিকার এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের যুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চিন রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অপরিশোধিত তেল কিনছে। আমেরিকাও রুশ পণ্য কেনায় পিছিয়ে নেই। এই অবস্থায় ভারতের উপর শুল্ক চাপানো অন্যায়। স্পষ্টভাবে নয়াদিল্লি জানিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে কম দামে তেল পাওয়া যাবে সেখান থেকেই তেল কিনবে ভারত। অন্যদিকে, সোমবার আহমেদাবাদের সভা থেকে মোদি কড়া ভাষায় বলেন, “শুল্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ সহ্য করব না। মাথা নত করব না। আমাদের সরকার ঠিক রাস্তা খুঁজে বের করবে।” মোদির কথায়, “ভারত এধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে এবং নাগরিকদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে।” তাঁর সংযোজন, “আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমাদের সরকার কখনই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পশুপালক এবং কৃষকদের কোনও ক্ষতি হতে দেবে না।
গত জুন মাসে কানাডায় জি২০ সম্মেলনের পর ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর সাক্ষাত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প আগে বেরিয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা ভেস্তে যায়। দাবি, এর পর মোদীকে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা এড়িয়ে যান। এ বার জাপান এবং জার্মানির সংবাদমাধ্যমের দাবি ঘিরে আমেরিকা এবং ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হল।












Discussion about this post