চলতি বছর অগাস্টে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ইউনূস তাঁর উদ্বেগের কথা দ্বর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে এও বলতে শোনা যায় মায়ানমারের জুন্টা সরকার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তার একটা সমবেত প্রতিবাদ হওয়া দরকার। ইউনূসের এই উদ্বেগের ভিন্ন একটা কারণ রয়েছে। মায়ামার থেকে রোহিঙ্গারা পিলপিল করে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে শুরু করে। এটা স্বীকার করে নিতে হয়, যে তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বর্তায় সে দেশের সরকারের ওপর। সুতরাং, তদারকি সরকার প্রধানের এই দাবি নিয়ে সেভাবে কিছু বলার থাকে না। তবে একেবারেই থাকে না, সেটা কোনওভাবে বলা যায় না। তার কারণও রয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে ইউনূসের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল তাদের ওপর সেনা নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কারণ, সে দেশের সেনা একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার কুৎসিত খেলায় মেতে উঠেছেন। যাকে বলে এথনিক ক্লিনজিং। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলছে, তা নিয়ে ইউনূসকে একটি শব্দ খরচ করতে দেখা গেল না। ভারত তো এই নিয়ে কড়া বিবৃতি দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ থেকে এই ইস্যুতে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মানবাধিকার দফতরের ফ্যাক্ট ফাই্ন্ডিং রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি বেছে বেছে হিন্দুদের টার্গেট করেছে। রেয়াত করা হচ্ছ না খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সহ অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে। অথচ ইউনূস বলছেন এই ধরনের কোনও ঘটনাই বাংলাদেশে ঘটেনি।
জাতিসঙ্ঘের ৮০ তম অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার এক ফাঁকে তিনি একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে এমন অভিযোগ ঠিক নয়। ইউনূস বলেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনও সংগঠিত সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। অপরাধের ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হিন্দুদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ঘটনা আগে থেকে অনেক বেড়েছে – এই অভিযোগ নস্যাৎ করে তদারকি সরকার প্রধান বলেন, এই সব তথ্য ভুয়ো খবরের ভিত্তিতে প্রচার করা হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনা তাঁর মতে, অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন।
হাসিনা ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পরে পরেই তদারকি সরকার প্রধান এবং সে দেশের কট্টর ইসলামী মৌলবাদী শক্তির নিশানা হয়ে ওঠেন হিন্দুরা। পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর চলে অত্যাচার। ভারতের একটি গণমাধ্যম এই নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তিনদিনের মধ্যে ২০০ জন হিন্দু জাতি বিদ্বেষের শিকার। পাঁচজনকে খুন করা হয়েছে। এই তাণ্ডবলীলা নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এই সব বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করা তো পরের কথা, দিনের পর দিন সেই অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে। লাফিয়ে বেড়েছে সংখ্যালঘুদের মৃত্যু মিছিল। জাতিসঙ্ঘের রিপোর্টে এও বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু হিন্দুদের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের আহমাদিয়া মুসলিম এবং ওই অঞ্চলে বসবাসকারী সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিবাদে অত্যাচার চালিয়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি মৌলবাদী সংগঠন। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘জুলাই অগাস্ট আন্দোলনের মাঝে এবং পরবর্তী কালে সংখ্যালঘু হিন্দু এবং আহমাদিয়া মুসলিম সহ চট্টগ্রামে বসবাসকারী সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির অত্যাচারে শিকার। ’ ওই বছর নভেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই ইস্যুতে একটি খবর প্রকাশ করে। সে খবরে বলা হয়, গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত দু হাজার হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে।












Discussion about this post