গত বছরের আগস্টে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো সেদিন নিহতই হতেন। সেই দিন ঠিক কি হয়েছিল, তার একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে সম্প্রতি প্রকাশিতব্য একটি বইতে। সেখানেই দাবি করা হয়েছে শেখ হাসিনার প্রাণ বাঁচে ভারত থেকে আসা একটি ফোনেই। ওই ফোনালাপের পরই তিনি বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, এবং আধঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরছেন, আর ফিরলেও সেটা কত দিনের মধ্যে। এই উত্তর খোঁজার আগে, পগত বছর প্রকাশ হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের একটি কভার স্টোরি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। টাইম ম্যাগাজিন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম হল – “বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে এক অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারেন”। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল বলছে, প্রায় এগারো মাসের মাথায় টাইম ম্যাগাজিনের দাবি বা ভবিষ্যতবাণী অনেকটাই ফলতে শুরু করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি আইটি ব্যবসা পরিচালনা করেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনিই প্রথম টাইম ম্যাগাজিনে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তাঁর মা অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর। সেই সাক্ষাৎকারে জয় তাঁর মায়ের সম্পর্কে বলেছিলেন, “দেশের পরিস্থিতি দেখে তিনি বেশ বিরক্ত এবং হতাশ, কারণ গত ১৫ বছর ধরে তাঁর সমস্ত কঠোর পরিশ্রম প্রায় বৃথা হয়ে যাচ্ছে”। টাইম ম্যাগাজিন সেই সময়ই শেখ হাসিনা সম্পর্কে দীর্ঘ কভার স্টোরিতে লিখেছিল, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনের পর, কার্যত প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানই হাসিনার আওয়ামী লীগ দ্বারা রাজনীতিকৃত হয়েছে। যার ফলে সেনাবাহিনী, আদালত, বেসামরিক পরিষেবা এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষেবাগুলির প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে দেশের ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশকে একত্রিত করার দায়িত্ব পড়েছে একদল বিক্ষুব্ধ ছাত্রনেতা এবং সামরিক জেনারেলদের হাতে, যারা অবশেষে হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপক, তাঁর হাতেই এখন বাংলাদেশের ভালোমন্দের ভার। তিনি ১৮ মাসে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট এক টেলিভিশন ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, “আমরা যদি এখন এই সুযোগটি হারাতে পারি, তাহলে আমরা একটি জাতি হিসাবে পরাজিত হব”।
এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাঁধছে ১৮ মাসেও নির্বাচনের নামগন্ধ নেই বাংলাদেশে। আদৌ কবে নির্বাচন হবে সেটা নিয়েও দেশবাসীর মনে ধোঁয়াশা রয়েছে। এই সরকারের জনসমর্থন আছে কিন্তু জনমত নেই, আবার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তখনই টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, যদি এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠী হাসিনার রেকর্ডের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারে। গত এক দশকে বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে উঠে এসেছে। যেখানে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৭১ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেখান থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এরমধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে, হাসিনার মুখ বিকৃত করা হয়েছে এবং তাঁকে স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ভয়াবহ গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। এটা তাৎক্ষণিক একটা ক্ষোভের বহিপ্রকাশ হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৃত হাল প্রকাশ করে না। ফলে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের একটা রাস্তাও তৈরি করেছে মৌলবাদীদের এই বিকৃত উল্লাস। বিশ্বের বহু রাজনৈতিক কলামিস্ট বলেছেন, হাসিনার প্রত্যাবর্তন “বেশ বিশ্বাসযোগ্য”। তাঁদের দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় বংশগত রাজনীতির ইতিহাস দেখলে, আপনি কখনই বংশগত দলগুলিকে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। এমনকি যখন তাঁরা পতনশীল বলে মনে হয় তখনও। আর ইউনূস সরকারের স্বৈরাচারি মনোভাব, উগ্র মৌলবাদীদের সংস্পর্ষ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের ফের হাসিনার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। আর সেই কারণেই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলি, যারা এতদিন ইউনূসের জয়গান করছিল তাঁরাই এখন শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়ে বড় করে ছাপছে। এটাই হল দেওয়াল লিখন, যা মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য সিঁদূরে মেঘ।
https://time.com/7028162/bangladesh-interim-government-sheikh-hasina-awami-league-sajeeb-wazed-joy/












Discussion about this post