এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এমনটাই দাবি সে দেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের। কিসের ষড়যন্ত্র, কার সঙ্গে ষড়যন্ত্র? উত্তরটা নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ওয়াশিংটন বিশ্বের প্রায় সব দেশের সঙ্গেই শুল্ক নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। সেই অনুযায়ী বাণিজ্য চুক্তিও হচ্ছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী যে দেশ শুল্কনীতি নিয়ে সমঝোতা করতে পারছে না, সেই দেশের পণ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা পাল্টা শুল্ক চাপাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ধার্য করেছে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। আগে বাংলাদেশি পণ্যে ১৫-১৭ শতাংশ শুল্ক বা ট্যারিফ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ১ আগস্ট থেকে পূর্ব ঘোষণামতো এর ওপর বাড়তি ৩৫ শতাংশ ট্যারিফ যোগ হবে। সবমিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যে ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক যোগ হবে। এ সব পুরোনো কথা, এখন সবাই জানেন। নতুন কথা হল, বাংলাদেশ নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছে। যা নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি।
ব্যাপারটা ঠিক কি? আওয়ামী লীগের দাবি, বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে আমেরিকার পদতলে সঁপে দিচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস, কেবলমাত্র নিজের গদি রক্ষার লোভে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দফতরের দেওয়া একটি চিঠি বাংলাদেশ সরকার গোপন রেখেছে। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একপেশে শর্তাবলি চাপিয়ে দিচ্ছে। আর সেই শর্তাবলি যাতে বাইরে না আসে তার জন্য একটি নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বা অপ্রাকাশযোগ্য চুক্তিও স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও কয়েকটি সূত্র দাবি করছেন, এই অপ্রাকাশযোগ্য চুক্তি ইতিমধ্যেই ফাঁস হয়ে গিয়েছে। এবং তাতে যা শর্তাবলি রয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিড়ম্বনার কারণ হতে চলেছে।
একই দাবি, গণঅভ্যুত্থানে গদিচ্যুত আওয়ামী লীগেরও। বাংলাদেশ থেকে কার্যত বিতারিত এই রাজনৈতিক দলটির দাবি, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সম্পদ আর জনগণের করের টাকা নিয়ে এক নীরব লুটের উৎসব চলছে। যার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুনাফালোভী শক্তি এবং দেশীয় কয়েকটি দালাল চক্র। এই দালালচক্রের নেতৃত্বে আছেন মুহাম্মদ ইউনুস। যিনি একজন অনির্বাচিত, জবাবদিহিতাহীন ব্যক্তিত্ব। আওয়ামী লীগের আরও দাবি, জনগণের কোনও মতামত, কোনও সংসদীয় বিতর্ক, এমনকি কোনও গণশুনানি ছাড়াই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। যা বাংলাদেশকে এক অন্ধকারময় অতীতে নিয়ে যেতে চলেছে। যদিও এই বিষয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনও মুখ খোলেনি। সরকারের তরফে এই বিষয়ে কোনও জবাবদিহি করা হয়নি। সেটা নিয়েও তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। তাহলে কি ব্যাপারটা সত্যি?
বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, ফাঁস হওয়া সেই অপ্রকাশযোগ্য চুক্তিতে এমন কিছু বিষয় আছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির। আসলে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু করেছে। বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনে রয়েছে। এই আলোচনার আগেই নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই অপ্রকাশযোগ্য চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করেছে বাংলাদেশকে। কি কি বলা আছে ওই চুক্তিতে? দাবি করা হচ্ছে, প্রথমেই যে উল্লেথযোগ্য, সেটা হল, বাংলাদেশ চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে কোনও বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারবে না। উল্লেখ্য বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে গম আমদানি করে এবং চিন থেকে প্রতিরক্ষা সাঁজ সরঞ্জাম আমদানি করে বিপুল পরিমানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিলে সেটা বন্ধ করতে হবে। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, সম্প্রতি জানা গিয়েছিল বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বেশি দামে গম আমদানি করতে চলেছে। টন প্রতি ২৫ ডলার বেশি দাম দিয়ে ওই গম আমদানি করা হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে বাংলাদেশ ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে চলেছে বলেও খবর। প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে দেশের বিমান পরিবহনের যে চাহিদা, তাতে কি এত সংখ্যক উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয়তা আছে? জানা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এই বিমান কেনার টাকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, আর কিস্তিতে শোধ করবে বাংলাদেশ সরকার। অর্থাৎ, নিজেদের স্বার্থে আরও বড় ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে চলেছে ইউনূস সরকার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অভিযোগ প্রায়সই করতেন যে, ২০০১ সালে খালেদা জিয়া আমেরিকার সঙ্গে গোপনে গ্যাস দেওয়ার চুক্তি করে ক্ষমতায় এসেছিল। আমেরিকা নাকি এ প্রস্তাব শেখ হাসিনাকেও দিয়েছিল। কিন্তু তিনি গোপনে দেশ বিক্রির চুক্তিতে রাজি হননি। এজন্য আমেরিকা তাকে ক্ষমতায় আনেনি। আওয়ামী লীগ সেই প্রসঙ্গ ফের টেনে এনে মুহাম্মদ ইউনূসকে নতুন করে আক্রমণ শুরু করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ইউনুসবাহিনী এই লুটপাট ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে শুধু অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে না, বরং দেশের সার্বভৌমত্বকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।












Discussion about this post