রবিবার বাংলাদেশে এক ঘটনাবহুল দিন ছিল, যা ওই দেশের রাজনীতিতে ইঙ্গিতপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। প্রথমেই কয়েকটি ঘটনা পর পর জেনে নেওয়া যাক, তারপরে বিশ্লেষণ করা যাবে।
প্রথম ঘটনা – বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। রবিবার বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ জেনারেল ওয়াকার প্রধান বিচারপতির গুলশানের বাসভবনে যান। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ একান্ত বৈঠক হয়, তবে কোন বিষয়ে এই বৈঠক তা জানা যায়নি।
দ্বিতীয় ঘটনা – বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল কামরুল হাসান রবিবার দুপুরে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের মধ্যেও দীর্ঘ বৈঠক হয়।
তৃতীয় ঘটনা – ঠিক একই সময় রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল হয়েছে। সেই মিছিলেন একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে আড়াইশো থেকে তিনশো লোকের মিছিল হয় ঢাকার রাস্তায়। জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পথচলতি মানুষজনও তাঁদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এত দ্রুত মিছিলটি শুরু হয় যে খবর পেয়ে বাহিনী পৌঁছনোর আগেই সকলে পালিয়ে যান।
চতুর্থ ঘটনা – আওয়ামী লীগ এই প্রথম জেনারেল ওয়াকারের সমর্থনে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সেনাপ্রধানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও অবমাননাকর মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে হেয় করে দেশের ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার নোংরা ষড়যন্ত্র চলছে। প্রশ্ন জাগে,কে বা কারা এই অপচেষ্টার নেপথ্যে? উত্তর স্পষ্ট যারা রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়, যারা অবৈধ অস্ত্রের জোরে ক্ষমতার ভাগ চায়, তারাই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এই অপতৎপরতায় লিপ্ত।
পঞ্চম ঘটনা – বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলি একযোগেই আচমকা অশান্ত হয়ে উঠেছে। চবিতে ছাত্রদের ওপর ব্যাপক হামলা. রাবিতে ছাত্রদল বনাম বাকি ছাত্ররা মুখোমুখি সংঘর্ষের লিম্প আবার ডাকসু নির্বানকে বানচাল করার জন্য হাইকোর্টের দারস্থ হয়েছে বামেরা। সবমিলিয়ে ফের একবার ছাত্র আন্দোলনের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে।
এই পাঁচটি বিষয় ছাড়াও আরও বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের অন্দরে। ইউনুস সরকারের একাধিক সূত্র বলছে,ওয়াকারের বিরুদ্ধে ফের আর্মি ক্যু করার দিকে এগোচ্ছে এক শ্রেণির সেনা আধিকারিকগণ। যদিও এর আগেও এই চেষ্টা একাধিকবার হয়েছে, কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের পদ এখনও টিকে আছে। ঠিক এই সুত্র ধরেই সেনাপ্রধানের আচমকা প্রধান বিচারপতির বাসভবনে গিয়ে বৈঠক করাটা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। আরেকটি সূত্র বলছে, এবার জেনারেল ওয়াকারই বাংলাদেশে ক্যু করার তোড়জোড় শুরু করেছেন। তাঁর চিন সফর থেকে ফেরার পরই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। জেনারেল ওয়াকারের অনুগত বাহিনী ইতিমধ্যেই তৎপরতা দেখাতে শুরু করেছে। এই আবহে ওয়াকারের বিরুদ্ধ গোষ্ঠী কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল কামরুল হাসানের প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎও গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যেই আদালতে মামলা চলছে। আগামী অক্টোবরে চুরান্ত শুনানি হতে পারে। সেনাপ্রধান কি সেই বিষয়েই আলোচনা করতে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে গেলেন? যদি তিনি নিজেই ইউনূস সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা হাতে নেন, সে ক্ষেত্রে আইনগত দিকগুলি খতিয়ে দেখলেন বলেও মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং কূটনীতি সম্পর্কে যারা খোঁজ খবর রাখেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বিশ্লেষকের দাবি, বর্তমান ইউনুস সরকারকে সরিয়ে আরেকটি ভারত- ও আওয়ামীলীগ-বান্ধব তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা হয়ে গিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আনার চেষ্টাও করা হচ্ছে। এবং তা ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই করা হতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমান বিচারপতির মেয়াদকাল আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে, সে ক্ষেত্রে তাঁকেই নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে নির্বাচন করানো হতে পারে। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের কঠিন সময় আসন্ন।












Discussion about this post