ভূ-রাজনীতির উসুল হল, এখানে কেউ মিত্র না, কেউ শত্রুও না। অর্থাৎ কাল যে আমার বন্ধু ছিল, আজ সে শত্রুতে পরিণত হতে পারে, আবার শত্রুই কখনও মিত্র হয়ে ওঠে। আর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এই মুহূর্তে এরকমই কিছু কোলাজে ঠাসা। চিনের তিয়ানজিনে শুরু হয়েছে সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও সম্মেলন। যেখানে এশিয়া মহাদেশের তাবড় রাষ্ট্রনেতারা উপস্থিত। রবিবার সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজিত ফ্যামিলি ফটো সেশন হল। সম্মেলনে উপস্থিত সমস্ত রাষ্ট্রনেতারা পাশাপাশি দাঁড়ালেন ছবি তোলার জন্য। আর সেখানেই এক ফ্রেমে বন্দি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সেহবাজ শরীফ। ওই একই সারিতে ছিলেন চিনের রাষ্ট্রপতি শি শি জিনপিং, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেস্কিয়ান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু। অপারেশন সিঁদুরের পর এই প্রথম একই মঞ্চে দেখা গেল নরেন্দ্র মোদি ও সেহবাজ শরীফকে। যদিও তাঁদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল এবং একে অপরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎটুকুও হয়নি বলে যানা গিয়েছে। এর মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হল পাক প্রধানমন্ত্রীর এক কাণ্ড, যা নিয়ে হাসির রোল উঠেছে। রবিবার ফ্যামিলি ফটোশুটের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে, সেই সময় পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ কার্যত ধাক্কাধাক্কি করেই পুতিনের সামনে আসার চেষ্টা করেন। যা দেখে থমকে যান রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট। এরপরই শাহবাজ হাসিতে গদগদ হতে করমর্দন করেন পুতিনের সঙ্গে। ভাবখানা এমন যে পুতিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে টেক্কা দিলেন। তবে পাক প্রধানমন্ত্রীর কীর্তি এখানেই থেমে নেই। চিনের তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন শেহবাজ শরীফ। সেখানে গিয়ে তিনি চিনে পাঠরত পাকিস্তানি পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানের সংবাদপত্র ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট শি যেভাবে ভাবেন, যে দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখেন, পাকিস্তানের বর্তমান সরকারও সেই ভাবেই চলার চেষ্টা করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা নিয়েও ট্রোল হতে শুরু করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী। কেউ কেউ বলছেন, ‘বন্ধুত্ব’ এতটাই যে পাকিস্তানকে যেন চিনের প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিতে পারলে তিনি বেঁচে যান। যদিও ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, অপারেশন সিঁদুরে প্রবল ধাক্কা খেয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছেন। ইতিমধ্যেই তিনি দুবার মার্কিন সফর করেছেন, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আসিম মুনিরই প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করার দাবি জানান। এর আগে পর্যন্ত পাকিস্তান ছিল চিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। অপারেশন সিঁদুরের পর চিনের হাত ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরতে চাইছে ইসলামবাদ। যা মোটেই পছন্দ করছে না বেজিং। অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ধাক্কা সামলাতে চিন ভারতের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। এক জোট হওয়ার চেষ্টায় ভারত, চিন ও রাশিয়া। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে মার্কিন হাত ধরার ফলে কার্যত একঘরে হয়ে পড়ছে ইসলামবাদ। ফলে এসসিও মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে কখনও চিনের প্রেসিডেন্টের ঢালাও প্রশংসা করছেন শেহবাজ শরীফ, আবার কখনও পুতিনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ধাক্কাধাক্কি করতেও পিছপা হচ্ছেন না তিনি। অপরদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, সম্মেলনের ফাঁকে, হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একে অপরের সঙ্গে আলোচনায় মশগুল তাঁরা। পাশেই এক ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ় শরিফ। তাঁর দৃষ্টি মোদি-পুতিনের দিকে। কিন্তু দুই রাষ্ট্রপ্রধানের কেউই পাক প্রধানমন্ত্রীর দিকে ফিরেও তাকালেন না।
শেহবাজ শরীফ ভালো করেই জানেন, ভারত ও চিনের সীমান্ত সমস্যা মিটে গেলে পাক অধিকৃত কাশ্মীর আর তাঁদের হাতে থাকবে না। কারণ কাশ্মীরের বিতর্কিত ওই অংশের কিছুটা চিনকে দিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। ইসলামবাদ ভালো করেই টের পাচ্ছে বেজিং কি চাইছে। ভারত ও চিন যদি জোট বাধে, তাহলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেবে। সেই জন্যই চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিংপিনকে সন্তুষ্ট করতে মরিয়া পাক প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গোটা বিশ্বকে শিখিয়েছেন কীভাবে বছরের পর বছর বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হয়। এই দুই দেশের বন্ধুত্ব শুধুমাত্র টিকে রয়েছে প্রতিশ্রুতি ও একই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে এতটা পথ পেরিয়ে এসেছে পাকিস্তান ও চিন। প্রসঙ্গত, তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পাক প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিচ্ছেন, তার আগেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সেরে ফেলেছেন মোদি ও জিংপিন। ইতিবাচক ওই বৈঠকে দুই দেশ বিবাদ ভুলে একে অপরের পরিপূরক হওয়ার বার্তা দিয়েছে। এটা পাকিস্তানের কাছে প্রতিকূল পরিবেশ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। যদিও পাক প্রধানমন্ত্রীর ভাষনেও সেই প্রতিকূলতার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। শেহবাজ বলেন, এই দুই দেশের বন্ধুত্ব চিরকাল টিকে থাকবে, সে যত বড়ই প্রতিকূলতা বা চ্যালেঞ্জ তৈরি হোক না কেন। এই সম্পর্ক সিল্ক রুটের মতোই পুরনো। তবে পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ চিন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে তেল মারার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু তাতে খুব একটা চিড়ে ভেজেনি। কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসসিও সম্মেলনের যাবতীয় ফোকাস টেনে নিয়েছেন। ফলে দু-নৌকায় পা দেওয়া পাকিস্তান এখন প্রবল চাপে, এ কথা বলাই বাহুল্য।












Discussion about this post