বাংলাদেশের রাজপথে নেমেছে সেনাবাহিনী। ঢাকা-সহ বাংলাদেশের একাধিক জায়গায় সেনা বাহিনীর ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ি রাস্তায় রাস্তায় টহল দিতে শুরু করেছে। কিন্তু কেন হঠাৎ সেনাবাহিনী এভাবে রাস্তায় নামলো? আসলে বিগত কয়েকমাসে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচনের দাবি উঠেছে। দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে সরব হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। যার মধ্যে অন্যতম বিএনপি। এবার ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের ডেডলাইন দিয়ে দিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও। ফলে প্রবল চাপে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাথায় বসে থাকতে হবে, নতুবা দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে আরও পাঁচ বছর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু ভয় একটাই, আওয়ামী লীগের পুনরায় উত্থান এবং বিদেশ ও দেশের মধ্যে ক্রমাগত নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি মুহাম্মদ ইউনূসকে বিচলিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি পদত্যাগের নাটক করে একটা চেষ্টা করেছিলেন দেশের ভিতরের হাওয়া বোঝার জন্য। কিন্তু তারপর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বুঝে যান, তাঁর পাশে বিএনপি নেই। ফলে তিনি এবার আওয়ামী লীগকেই ঢাল করে নতুন চাল দিলেন। রবিবার বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঢাকায় নিজ সরকারি বাসভবনে বৈঠকে বসেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। সেই রাতেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম সাংবাদিক সম্মেলনে ওই বৈঠকের নির্যাস তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার পরে সে দেশের ভেতরে ও বাইরে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য এবং গোলামিতে ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্যই এ সব করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলমের বক্তব্যই অন্তবর্তীকালীন সরকারের বক্তব্য। ফলে তিনি যে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের জুজু দেখিয়ে যে মন্তব্য করেছেন সেটা হল ইউনূসের প্ল্যান বি। সর্বদল বৈঠকে সেটাই করতে চেয়েছেন ইউনূস। যাতে স্বৈরাচারি শক্তি বলে দেগে দেওয়া আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে নিষিদ্ধ করাই সেনাপ্রধানের রাগের কারণ, এটা বোঝানো যায়। কিন্তু তাতেও কি চিড়ে ভিজলো? সোমবারও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেওয়া এক ভাষণে দাবি করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন করাতে হবে। তারেক রহমান কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের জনগণ সরকারের করুণার পাত্র নয়। সরকার অবশ্যই জনগণের ন্যায্য দাবি মানতে বাধ্য। এখানে সরকারের মান-অভিমান বা রাগ-বিরাগের কোনও সুযোগ নেই। ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে সোমবার বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও এক সাংবাদিক সম্মেলন করে। সোমবার সেনানিবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উল-দৌলা এবং মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা বলেন, ‘যেভাবে কথা আসছে যে সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিশাল মতপার্থক্য হয়েছে, বিভেদ রয়েছে, মিডিয়াতে বিষয়টি যেভাবে আসছে, এ রকম আসলেই কিছু হয়নি। আমরা একে অপরের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সুন্দরভাবে কাজ করছি। এটা ভুলভাবে ব্যাঅখ্যাম করার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে রাখাইন মানবিক করিডোর নিয়েও এদিন মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো কাজে সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত হবে না।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দেশ ও বিদেশে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে যে চর্চা চলছে সেটা কার্যত দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করল বাংলাদেশ সেনা। তবে এও মনে করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে সেনাপ্রধানের চাপ রয়েছে, তা এখনও বহাল রেখেছে সেনাবাহিনী। কয়েকটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানের ভয় পাচ্ছেন মহম্মদ ইউনূস। তাই বারেবারে তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এও জানা যাচ্ছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তিনি ৭ বার সেনা প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু কোনও বারই সাড়া দেয়নি সেনাপ্রধান। অবশেষে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ সেনা। রাখাইন করিডোর নিয়ে যে তাঁরা এখনও তাঁদের সিদ্ধান্তে অনড় সেটাও বুঝিয়ে দিল। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে এখন বাঁচার পথ একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং ভারত বিরোধিতার রাস্তা। তাই সর্বদলীয় বৈঠকের নামে কয়েকটি ছোটখাটো রাজনৈতিক দলকে সামনে এনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলে দিলেন আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার পরে বাংলাদেশের ভিতরে এবং বাইরে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে।












Discussion about this post