সোমবার দুপুরে ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের কয়েকটি ক্লাসরুমের ছাঁদে ভেঙে পড়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। যার ফলে এখনও পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ৮০ জন মতো। সোমবার থেকে বুধবার, ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজের বাসভবন থেকে বের হননি, এমনকি তাঁর শোকবার্তা দিতেও সময় লেগেছে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। একটি ভিডিও বার্তায় শোকবার্তা দেওয়ার সময় তাঁকে প্রবল শোকাচ্ছন্ন লাগছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি কান্নায় ভেঙে পড়বেন। কিন্তু তাঁর একবারও সময় হল না, শোকে পাথর হয়ে যাওয়া অভিভাবকদের সঙ্গে একবার দেখা করতে। সময় হল না হাসপাতালে আহতদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করতে। কিন্তু তিনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন যমুনায় বসে। যা নিয়ে বাংলাদেশে ক্ষোভের জন্ম হয়েছে।
ইউনূসের শোকবার্তায় একটি অংশে তিনি বলছেন, মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের যে দুর্ঘটনা, প্রশিক্ষণ বিমান বিদ্ধস্ত হয়ে এই কচি শিশুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আগুনে পুড়ে মরল, মা-বাপদের আমরা কি জবাব দেব?
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, প্রশিক্ষণ বিমান ঝাঁপিয়ে পড়ল কথাটার অর্থ কী? তাহলে কি তিনি এই দুর্ঘটনাকে অন্তর্ঘাত বা নাশকতা বলতে চাইছেন? তাঁদের এই দাবি আরও জোরালো হচ্ছে যখন দেখা গেল প্রধান উপদেষ্টা তড়িঘড়ি বৈঠকে ডাকলেন চার রাজনৈতিক দলকে। ওই বৈঠকের পরই বিদ্রুপ, কটাক্ষ করে অনেকেই সমাজমাধ্যম-সহ নানা জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন, যে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে সেটির নিহত পাইলট মহম্মনদ তৌকির আহমেদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দোসর ছিলেন? উল্লেখ্য, মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় তাঁর বাসভবন যমুনায় প্রথমসারির কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকে আলোচনায় ডেকেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এই চারটি দল হল বিএনপি, জামায়তে ইসলামী, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জানা যাচ্ছে, বিমান বিধ্বস্ত হওয়া পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ডাকা এই বৈঠকের আলোচনা কার্যত ঘুরে যায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিভিন্ন দল মিলে কীভাবে আওয়ামী লিগকে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই, সমাজমাধ্যমে এটা নিয়ে কটাক্ষের বন্যা বইছে। সূত্রের খবর ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আমাদের মধ্যে যে ঐক্য আছে, সেটা আরও বেশি দৃশ্যমান হলে ভাল হয়। আপনারা ফ্যাসিবাদবিরোধী কোনও প্রশ্নে হোক বা গঠনমূলক কোনও কর্মসূচিতে যদি একসঙ্গে থাকেন এবং সেটা যদি মানুষ দেখে, তাহলে মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তির ভাব আসবে। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, দেশে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। তিনি প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা খুব জরুরি। জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকে গোপালগঞ্জের প্রসঙ্গও উঠে আসে। গোপালগঞ্জে আওয়ামী লিগের প্রতিরোধের নিন্দা করে ফ্যাসিবাদের জাগরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুহাম্মদ ইউনুস এবং এনসিপি নেতারা। অপরদিকে, বিএনপি তাঁদের নির্বাচন ইস্যুতেই অনড় ছিলেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির দাবি করেছেন, চলতি অস্থিরতার অবসানে একমাত্র উপায় নির্বাচন। যতদ্রুত নির্বাচন হয় ততই মঙ্গল। তবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলায় সেখানে উপস্থিত সব রাজনৈতিক দলই একবাক্যে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। মজার বিষয় হল, যে বিষয় নিয়ে এই বৈঠক ডাকা হয়েছিল, সেটা নিয়েই খুব সামান্য কথা হয়েছে। বাকি সময় আওয়ামী লীগের মোকাবিলা করার রণকৌশল ঠিক হয়।
অর্থাৎ, বিমান দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভ হয় মাইলস্টোন স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গন, ঢাকা সচিবালয় এবং হাসপাতালগুলির বাইরে। পুলিশকে লাঠিপেটা করতে হয়েছে, কাঁদানে গ্যাসের সেল, সাউন্ড গ্রেনে়ড ফাটাতে হয়েছে। বহু পড়ুয়া আহত হয়েছেন। এমনকি কলেজে নয় ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় দুই উপদেষ্টাকে। মঙ্গলবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে পড়ুয়াদের ৬ দফা দাবি, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, সরকারের বিরুদ্ধে কেন ক্ষোভ, সে বিষয়ে ওই বৈঠকে কোনও আলোচনাই হয়নি। এমনকি ঢাকার মতো জনবহুল এলাকার আকাশে কেন যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ হবে, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়নি। এটাই মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশ। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই মজার ছলে লিখেছেন, বৈঠকে যে আলোচনা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে, সরকার ও উপস্থিত দলগুলি মনে করে সেই বিমানের পাইলটও আওয়ামী লিগ তথা হাসিনার দোসর ছিলেন। তাঁকেও ফ্যাসিবাদীদের লোক মনে করা হচ্ছে।










Discussion about this post