চার দিনের লন্ডন শহরের উদ্দেশ্যে উড়ে গেলেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু যাওয়ার আগে সঙ্গে নিয়ে গেলেন এক চরম অস্বস্তিকর পরিবেশ। কারণ শেখ হাসিনার বোনঝি তথা ব্রিটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিক! তিনি মুহাম্মদ ইউনূসকে কার্যত খোলা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছেন। দুর্নীতি প্রশ্নে তাঁর বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ আছে, সেটা নিয়ে সামনাসামনি বসে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর যে যে অভিযোগ করে মামলা চালাচ্ছে সেটা নিয়ে মুখোমুখি বসুক মুহাম্মদ ইউনূস। আর সেটা ব্রিটিশ পার্লামেন্টেই। ইংল্যান্ডের প্রথম সারির সংবাদপত্র দি গার্ডিয়ান-সহ অন্যান্য সমস্ত পত্রিকা এই খবর গুরুত্ব দিয়েই ছেপেছে। যা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের লন্ডন সফরের আগে যথেষ্টই অস্বস্তিজনক। যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, তারা এমন কোনও চিঠি পায়নি। কিন্তু ব্রিটেনের ঝানু রাজনৈতিক টিউলিপ সেই চিঠি নিজের সমাজ মাধ্যমের পাতায় শেয়ার করে দিয়েছেন।
টিউলিপ ব্রিটেনের শাসকদল লেবার পার্টির নেত্রী। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সের নির্বাচনে চার বার জয়ী হয়ে সাংসদ হয়েছেন। একসময় তিনি ব্রিটেনে সিটি মিনিস্টার ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ সামনে আসার পর নিজে থেকেই মন্ত্রীত্ব ছাড়েন এবং সেই অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্তের সামনে আসেন তিনি। গত জানুয়ারিতে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দেন তিনি। গত বছর টিউলিপ সিদ্দিক নিজেকে ব্রিটেনের মন্ত্রী পর্যায়ের মানদণ্ড বিষয়ক উপদেষ্টার কাছে পেশ করেছিলেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা মন্ত্রী ও সাংসদদের মানদণ্ড যাচাই করেন। সেই দফতর সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গত জানুয়ারিতে টিউলিপকে যে কোনও অন্যায় কাজের জন্য দায়মুক্তি দিয়েছে। অর্থাৎ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ খারিজ করেছে। যদিও টিউলিপ এখনও মন্ত্রীত্ব গ্রহন করেননি। এবার তিনি বড় চাল দিলেন। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে আসার ঠিক আগেই তাঁর সাক্ষাৎ চেয়ে চিঠি দিয়ে বসলেন। টিউলিপ সিদ্দিক চিঠিতে দাবি করেছেন: “এই ফ্যান্টাসি তদন্তের প্রতিটি পদক্ষেপ গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে, তবুও আমার আইনি দলের সাথে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি। তাঁর দাবি, যে তাঁর খালা অর্থাৎ শেখ হাসিনার বিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত “রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার” তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। টিউলিপ জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলির প্রমান দিক বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন বা দূদক। জানা যাচ্ছে, ইউনূসের সঙ্গে এই সফরে দূদকের চেয়ারম্যানও সঙ্গে গিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের দাবি, টিউলিপ সিদ্দিক মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলে দিলেন। কারণ, এই সফরে ব্রিটেনের রাজার থেকে যেমন তাঁর একটি সম্মানিক পুরস্কার নেওয়ার কথা, তেমনই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। জানা যাচ্ছে, এই বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে দরবার করতেন। কিন্তু ব্রিটেনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরই এক সাংসদের বিরুদ্ধে তোলা বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুতর অভিযোগ এবং সেই সাংসদের অভিযোগ নিয়ে খোলা চ্যালেঞ্জ একেবারেই বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে ইউনূসকে।
শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিকের জন্ম ব্রিটেনেই। সেখানেই পড়াশোনা এবং রাজনীতিতে প্রবেশ। তিনি মুহাম্মদ ইউনূসকে লেখা চিঠিতে সেটা উল্লেথ করে বলেছেন, আমি একজন ব্রিটেনের নাগরিক। লন্ডনে জন্ম হয়েছে। আমি হাম্পস্টেড ও হাইগেটের সংসদীয় প্রতিনিধি। আমার বাংলাদেশে কোনও সম্পত্তি বা ব্যবসা নেই। সেই দেশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার সেখানে জন্ম হয়নি। আমি বড়ও হয়নি। এই গোটা ঘটনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু টিউলিপ ও তাঁর মা অর্থাৎ শেখ হাসিনার বোন রেহানার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন। তারা জানিয়েছিল, টিউলিপ ও রেহানা ঢাকার পূর্বাঞ্চলে ৭ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি জমি হাতিয়ে নিয়েছেন পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে। এমনকি, গত মাসে টিউলিপের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরয়ানা জারি করেছে বাংলাদেশের এক আদালত। প্রশ্ন ওঠে একজন ব্রিটিশ নাগরিক এবং সেই দেশের সাংসদ তথা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা যায় কিনা। তিনি দাবি করেন যে, এমন কোনও পরোয়ানা বা আদালতের শুনানির বিষয়ে তার কোনও জ্ঞান নেই যেখানে তাকে হাজির হতে বলা হয়েছে। টু-বি প্রত্যর্পণ দেশ হিসেবে ব্রিটেনের কোনও মন্ত্রী এবং বিচারকদের গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে হবে। এবার সেটা চেয়েই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে বেকায়দায় ফেললেন শেখ মুজিবর রহমানের নাতনি টিউলিপ সিদ্দিক।












Discussion about this post