বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়ে ঢাকার একাধিক রাস্তার দখল নিয়েছে জুলাই আন্দোলনের আহত ও তাঁদের পরিবার-পরিজনেরা। আর এই ঘটনা ঠিক এমন সময়ে ঘটল, যখন মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছয় মাস পূর্ণ করতে চলেছে। উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসের ৫ তারিখ যখন গণ অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তার আগে জুন জুলাই মাস ধরে চলে বড় সর আন্দোলন। হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার। এরপর পদ্মার বুকে বয়ে গিয়েছে বহু জল, কিন্তু বাংলাদেশ আছে বাংলাদেশেই। জুন ও জুলাই মাসে সহিংস আন্দোলনের জেরে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিলেন। বহু মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। ক্ষমতায় এসে ইউনূস ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছিলেন জুন জুলাইয়ের আন্দোলনে আহত ও ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারের থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাবেন। এও দাবি করা হয়েছিল গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হবে।
কিন্তু প্রায় ছয় মাস হতে চলল, কিন্তু বহু আহত ঠিকঠাক সাহায্য পাননি বলেই অভিযোগ। এর জন্য কয়েকদিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল। এবার তা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল ঢাকার রাস্তায়। শুধু তাই নয়, পুলিশ ও সেনার বাঁধা টপকে তাঁরা পৌঁছে গেলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার একেবারে সামনে। যা নিয়ে রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত তীব্র উত্তেজনা দেখা গেল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বহু কষ্টে আন্দোলনকারীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিরস্ত করেন। না হলে বড় লজ্জার মুখে পড়তে হত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শান্তির নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে।
প্রসঙ্গত, গত ৫ অগাস্ট গণ-অভ্যুত্থান ও তার আগের সহিংস আন্দোলনের জেরে যারা আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তাঁদের জন্য জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠন করেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সরকারি পৃষ্ঠেপোষকতায় এই ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করে। কিন্তু অভিযোগ, বহু আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ওই ফাউন্ডেশনের দরজায় কড়া নেড়েও কোনও সাহায্য পাননি। এর জন্য ক্ষোভ জমতে শুরু করেছিল তাঁদের মনে। ধীরে ধীরে ক্ষেপে উঠছিলেন সাধারণ মানুষও। আরও অভিযোগ আছে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছেন। তাঁরাও নাকি আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেননি। এমনকি শনিবার রাত থেকে তাঁরা রাজধানীর রাস্তায় প্রতিবাদে শামিল হলেও প্রশাসনের তরফে কেউ খোঁজ খবর নিতে আসেননি।
রবিবার রাত থেকে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। প্রথমে বিক্ষোভকারীরা প্রধান উপদেষ্ট মহম্মদ ইউনুসের সরকারি বাড়ি ঘেরাও করার জন্য এগোতে থাকেন। অভিযোগ, পুলিশ সরিয়ে দেয়। বাঁধা পেয়ে প্রথমে কিছুটা পিছিয়ে আসেন আন্দোলনকারীরা। তাঁরা ঢাকার সাত তারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে জড়ো হয়ে সেখানে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য সেখানে থাকা বিদেশী অতিথি ও কূটনৈতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিক্ষোভকারীদের মূল বক্তব্য, সরকারের অমানবিকতা সব সীমা ছাড়িয়েছে।
এরপর রবিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের ব্যারিকেড ভেঙে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে এগিয়ে আসেন বিক্ষোভকারীরা। কার্যত ওই এলাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের দখলে চলে যায়। সেনা ও পুলিশ কোনও রকমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। গভীর রাতে সেখানে উপস্থিত হন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং আরও কয়েকজন ছাত্রনেতা। তিনি কোনও রকমে বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিক্ষুব্ধদের তুমুল চিৎকার ও হট্টগোলের কারণে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাসনাত আবদুল্লাহ কোনও কথা বলতে পারেননি। পরে তিনি বলেন, “আমরা চাইছিলাম কি, দেশটা সুন্দরভাবে চলুক। এ জন্যই তো সৎ উপদেষ্টাদের আইন্যা দিলাম। কিন্তু সৎ উপদেষ্টারা যে এত আমলানির্ভর হবেন, তা আমরা বুঝি নাই। এখনও দেখি তাঁরা আরও বেশি নিয়মতান্ত্রিক। নিয়ম কী, একটা স্লিপ একবার দিছে, এটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দিছে, আরে ভাই আমি হসপিটালে ভর্তি, আমার আবার এই স্লিপ কী কাজে লাগবে?”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক নিজেই তাঁদের সরকারকে দায়ী করছেন। এটা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসার জন্য যে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছিল তাঁর সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন আরেক ছাত্র নেতা সারজিস আলম। কিন্তু গত মাসেই তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। জানা যাচ্ছে, এই হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে বিরোধের জেরেই নাকি সারজিস সরে গিয়েছেন। এবার হাসনাত আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পেতে দেরির পিছনে আমলাতন্ত্রকেই দায়ী করে দায় সারলেন। অপরদিকে আন্দোলনকারীরা কোনও মতেই পিছু হঠতে নারাজ। তাঁরা বলেই দিচ্ছেন যতক্ষণ না সুরাহা না হচ্ছে, ততক্ষন তাঁরা পথ থেকে সরবেন না। অর্থাৎ আন্দোলন চলবে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এটা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সরকারের কাছে যথেষ্ট চাপের কারণ।











Discussion about this post