বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বহু বছর ধরেই অসুস্থ। গত বছর আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। এর পর থেকে দুই তিনটি অনুষ্ঠান ছাড়া কার্যত ঘরবন্দি ছিলেন অসুস্থতার কারণে। গত মাসের মাঝামাঝি তিনি লন্ডনে চিকিৎসা করাতে যান এবং এখন খানিকটা সুস্থ হয়ে সেখানেই রয়েছেন ছেলে তারেক রহমানের কাছে। বিএনপি নেত্রীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে তাঁকে চিঠি দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দলনেত্রীর কাছে পাক প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো শুভেচ্ছা চিঠির কথা বেমালুম চেপে গিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু গত ৩১ জানুয়ারি সেই চিঠির কথা জানাজানি হয়ে যায়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, সেই চিঠির কথা বিএনপি নেতৃত্ব সরকারিভাবে স্বীকার করেনি এখনও। কোনও ভাবে তা প্রকাশ পেয়েছে। এই ঘটনায় অবাক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শিবির। কারণ বিএনপি ও পাকিস্তানের মধ্যে মাখামাখি সম্পর্ক কারোরই অজানা নয়। তবুও পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের পাঠানো চিঠির কথা কেন চেপে গেল বিএনপি? এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন ওয়াকিবহাল মহল।
মাস খানেক আগেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি বা বিএনপি-র যুগ্ম মহাসচিব রাহুল কবীর রিজভী কার্যত নিয়ম করে ভারতকে গালাগাল দিতেন, কথায় কথায় ভারত বিরোধিতার সুর শোনা যেত তাঁর মুখে। সেই সিনিয়র নেতার মুখে এখন ভারত সম্পর্কে কুলুপ। এটাও নজর এড়ায়নি ওয়াকিবহাল মহলের। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কী বিএনপি এবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি করতে চাইছে? আর সেই কারণেই কী পাক প্রধানমন্ত্রীর চিঠির কথা গোপন করা হয়েছিল? বেগম খালেদাকে পাক প্রধানমন্ত্রীর চিঠি লেখার বিষয়টি জানাজানি হতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তা নিয়ে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে। চর্চা চলছে ভারতে ও পাকিস্তানেও। বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে, যে বিএনপি ঘোষিতভাবে পাকিস্তানপন্থী এবং ভারত বিরোধী মনোভাবাপন্ন, সেই বিএনপি কী এবার ভারত সম্পর্কে সুর নরম করতে চাইছে? পাশাপাশি এই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে যে, নয়া দিল্লির প্রতি ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিতেই কি ইসলামাবাদ নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না খালেদা জিয়ার দল?
সূত্রের খবর, বেগম খালেদা জিয়া এখন তুলনামূলকভাবে সুস্থ এবং লন্ডন ক্লিনিক থেকে ছাড়াও পেয়েছেন। এখন তিনি ছেলে তারেক রহমানের বাসায় উঠেছেন। প্রসঙ্গত, তারেক বহু বছর ব্রিটেনের রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তাঁরা কবে বাংলাদেশ ফিরবেন এ সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতিতেই খালেদাকে লেখা পাক প্রধানমন্ত্রীর চিঠি এখন যাবতীয় রাজনৈতিক চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হল, বিএনপি নেতৃত্ব দলের তরফে সরকারিভাবে চিঠিটি প্রকাশ করেনি। চিঠিটি মিডিয়ার হাতে আসার পরও বিএনপি নেতা-নেত্রী বা মুখপাত্র ওই চিঠির বিষয়ে মিডিয়ার কাছে মুখ খোলেননি। তবে বিএনপি মুখপাত্রদের দাবি, ওই চিঠি সম্পর্কে শীর্ষ নেতৃত্ব কিছু জানায়নি। পাক প্রধানমন্ত্রীর চিঠির কথা আমরাও মিডিয়া থেকে জেনেছি। বিএনপি’র কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। দলে তিনিই এখন শেষ কথা। ফলে তিনি বা মহাসচিব কেউই এই বিষয়ে মুখ খোলেননি। কিন্তু কেন?
কূটনৈতিক মহলের পর্যপেক্ষণ, বিএনপি শীর্ষ নেতারা গত দেড়-দু’মাস যাবত ভারত বিরোধিতায় লাগাম টেনে দিয়েছেন। এমনকি রাহুল কবীর রিজভীর ভারতীয় পণ্য পোড়ানো, ভারত বয়কটের ডাককেও তাঁর ব্যক্তিগত মতামত বলে দায় এড়িয়েছে বিএনপি। এর থেকেই বোঝা যায়, অতীত ভুলে বিএনপি এবার ভারতের কাছে আসতে চাইছে। গত আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বিএনপি বার্তা দিয়েছিল, ভারত এতদিন শুধু একটি দল ও সেই দলের নেত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। অর্থাৎ আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনার কথা বলা হয়েছিল। সে সময় বিএনপি নেতারা এও বলেছিলেন, ভারতের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ মানে শুধু শেখ হাসিনা নন। বিএনপি নেতাদের এই বক্তব্যের পরই ভারত সুকৌশলে বার্তা দিয়েছিল। ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার প্রণয়কুমার ভার্মা খালেদা জিয়ার দলের দফতরে গিয়ে পার্টির প্রথমসারির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে আসেন। এর ঠিক উল্টো দিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্যতা বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সমানতালে তৎপর ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তানের হাই কমিশনারও। ঢাকায় পাকিস্তানের জাতির পিতা মহম্মদ আলি জিনহার জন্ম ও মৃত্যু দিন উদযাপন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের নামী শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো। আবার দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী জাহাজ যাতায়াত শুরু হয়েছে। ঠিক সেই সময়, সুর পাল্টে ভারত সম্পর্কে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে বিএনপি। যা নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে চাপে রাখছে।











Discussion about this post