এই মুহূর্তে একটাই চর্চা, কি চলছে বাংলাদেশে? মুহাম্মদ ইউনূসের রাজত্বকালে বাংলাদেশে যেহেতু সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে, সঠিক ও নির্ভিক সংবাদ পরিবেশনে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে, সেহেতু ওই দেশ থেকে সঠিক সংবাদ পাওয়া বাতুলতা। ফলে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম নিজেদের মতো করে সংবাদ সংগ্রহ করে, এবং বিভিন্ন বিষয়কে একত্রিত করে বিশ্লেষণ করে সংবাদ পরিবেশন করছে। তাতে যেমন কিছু ভুল হয়ে যাচ্ছে, আবার অনেকটা মিলেও যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের তদারকি সরকারের উপদেষ্টাদের কয়েকজন ক্রমাগত বলে বেরাচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যম ভুল খবর প্রচার করছে, গুজব ছড়াচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এটা নিজেদের মিডিয়ার ওপর দমননীতি চাপতেই এই ধরণের প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু আদৌ কি তাই? আসলে বারবার ঘুরেফিরে আসছে ওই একটাই প্রশ্ন, কি চলছে বাংলাদেশে?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসকরা ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার আগে সুকৌশলে অখণ্ড ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে যায়। আর সেটাই ছিল তাঁদের দুষ্ট কৌশল। যাতে একটা চিরস্থায়ী ভেদাভেদ থেকে যায়। ভারতের পশ্চিম দিকে পাকিস্তান ও পূর্ব দিকে পূর্ব পাকিস্তান। সেই থেকে শুরু। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ উৎপন্ন হলেও সেই ভেদাভেদ কমেনি। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমানে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশজুড়ে যে ধরণের ভারত বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি যোগ ও পাকিস্তানী যোগ। যা ভারতকে বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ফলে ভারতীয় মিডিয়া যদি মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের পতন চায় এবং ভারত বন্ধু হিসেবে পুনরায় শেখ হাসিনার উত্থান চায় তাহলে তাতে অন্যায় কোথায়? শরীরে একটা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত অনেক সময়ই ক্যানসারে পরিণত হয়। যা এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই ভারতবাসী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নয়, পুনর্বাসন দিলেই খুশি হবে। দেশবাসীর এই প্রত্যাশা ভারতীয় মিডিয়া ও ইউটিউবাররা তুলে ধরছে, সেই সঙ্গে বিভিন্ন সূত্র ধরে ভারত কি করতে চলেছে সেটাও বিশ্লেষণ করছে। এতে অনেক সময় ভুল হচ্ছে, আবার ঠিকও হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেল, আচমকা ঘুম ভেঙে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান একটা অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা দিলেন। তিনি নানাভাবে বুঝিয়ে দিলেন, বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে তা ভালো হচ্ছে না। তিনি তদারকি সরকার ও দেশের রাজনৈতিক মহলকে সতর্কও করে দেন।
তিনি কেন, কোন পরিস্থিতিতে আচমকা এই ধরণের মন্তব্য করলেন, কেনই বা দেশের রাজনৈতিক মহলকে সতর্ক করলেন সেটা নিয়ে কাটাছেড়া চলছে। জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বক্তব্য নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। কিন্তু তাঁর মন্তব্যের পরপর তিনি যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেন তা কিন্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে আমরা যখন দেখা গেল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চূড়ান্ত ডামাডোলের মধ্যেও তাঁর মধ্য আফ্রিকা সফরে যাওয়া। একটা সেনা বিদ্রোহের আঁচ উপলব্ধি করে তাঁর দ্রুত ফিরে আসা এবং সেনাবাহিনীতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। এর মধ্যেই খবর পাওয়া গিয়েছিল লেফটান্যান্ট জেনারেল ফয়জুর রহমানের গ্রেফতার প্রসঙ্গে। সেটা নিয়ে বাংলাদেশী মিডিয়া কোনও সঠিক প্রামান্য তথ্য দিতে পারেনি। কিন্তু খবরের সত্যতাও স্বীকার করা হয়নি। ধরেই নেওয়া গেল, লেফটান্যান্ট জেনারেল ফয়জুর রহমানের গ্রেফতারের খবর ভুল। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব যে আছে সেটা অস্বীকার করা যায় কি? এটা তো ঐতিহাসিক সত্য। ফলে যদি জেনারেল ওয়াকার উজ জামান বাহিনীতে পূর্ণ কর্তৃত্ব হাতে নেওয়ার জন্য, ফইজুর রহমান বা কামরুল হোসেনের মতো সেনা কর্তাকে গ্রেফতার বা নজরবন্দি করেন, তাতে খুব একটা ভুল থাকে না। কিছু একটা তো চলছেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্দরে।
এবার আসা যাক শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে। ভারত বরাবরই বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে এসেছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ভারত যে খুব একটা দাদাগিরি দেখিয়েছে, তার একটা উদাহরণ দেখাতে পারবে না সে দেশের মিডিয়া। তবে ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে একটা বিতর্ক উঠতেই পারে। কিন্তু ওই বাঁধ নির্মাণ হয়েছিল আন্তর্জাতিক আইন মেনে এবং পরবর্তী সময় দুদেশের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে জল বন্টন চুক্তিও হয়। ফলে একেবারেই যে ভারত দাদাগিরি করেছে এ কথা হলফ করে বলা যাবে না। ভারত বরাবরই চেয়েছিল আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিএনপি বা জামাতের মতো দলগুলির সঙ্গে সখ্যতা বাড়াতে। কিন্তু বিএনপি বা জামাত পাকিস্তান প্রেমে এতটাই মজে যে ভারতের সঙ্গে দূরত্বই বজায় রেখেছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির থেকে কিছুটা আলাদা। অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করে আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধর সময় থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ট। ভারতে কংগ্রেস বা যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকুক বা বর্তমান বিজেপি সরকার, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের একটা আত্মিক সম্পর্ক থেকেই গিয়েছে। বর্তমানে এই কঠিন সময়েও ভারত হাসিনাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। অন্যদিকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে ভাবে ভারত বিরোধী মনোভাব এবং জঙ্গি কার্যকলাপ হচ্ছে তাতে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে বেশিদিন ক্ষমতায় রাখা ভারতের জন্য হুমকি হবে। বিশেষ করে আগামী ২৬ মার্চ মুহাম্মদ ইউনূসের চিন সফরের কথা জানাজানি হওয়ার পর এই আশঙ্কা আরও তীব্র হচ্ছে। কারণ ইউনূস যে তিস্তা প্রকল্পের আড়ালে চিনকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাতে এবং ভারতের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলার জন্য চিনকে আহ্বান জানাতে যাচ্ছেন। ফলে এই পরিস্থিতিতে ভারত যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তাই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নেতৃত্বে বাংলাদেশে কিছু একটা ঘটতে চলেছে, সেটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বিশেষ করে নয়া দিল্লিতে যে পরিমান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তাতে এটা বলাই যায়। অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের ভার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন, এটাও সঠিক। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করে নিতে অসুবিধা কোথায়। অপরদিকে, আচমকা বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে হিজবুত তেহরীর মতো সরকারের কাছের সংগঠনের মিছিলে বেপরোয়া লাঠিচার্জের ঘটনা সেটারই প্রমান দিচ্ছে। এবার সেনাপ্রধানের তত্ত্বাবধানেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন এবং মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতাচ্যুত হবেন, এটাও স্বাভাবিক।












Discussion about this post