বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার পতন যে একটা গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল এটা এখন দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। সেই অর্থে মুহাম্মদ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে ভারত সরকার হাবেভাবে বুঝিয়ে চলেছে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে তাঁরা মান্যতা দিচ্ছে না। যেমন শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তাঁকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে রাখা হয়েছে। হাসিনাকে কোথায় রাখা হয়েছে, সেটা বিগত সাতমাসেও কাকপক্ষী জানতে পারেনি। অপরদিকে, হাসিনার প্রত্যাবর্তন চেয়ে বাংলাদেশের তদারকি সরকার ভারত সরকারকে সরকারিভাবে চিঠি বা নোট ভার্বাল দিয়েছে, কিন্তু ভারত তার জবাব পর্যন্ত দেয়নি। এই কথা নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। অথচ সেই সরকারের উপদেষ্টাদের হম্বিতম্বি কমার লক্ষণ নেই। ভারত এর আগে বহুবার উপদেষ্টাদের ভারতবিরোধী মন্তব্য বা উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখার ব্যাপারে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু তাতেই তাঁরা থামেননি। বরং সে দেশে ভারতবিরোধী কাজকর্ম বা ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে পারে সেই ধরণের কাজকর্ম বেড়েই চলেছে। ফলে এই মুহূর্তে ভারত সরকার আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছে না। বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূস বা বর্তমান ক্ষমতাসীন সংগঠনগুলি আরও কিছুদিন থাকলে ভারতের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত সচেষ্ট ইউনূস এবং তাঁর দলবল। সেই কারণেই আওয়ামী লীগের কোমড় ভেঙে দিতে অপারেশন ডেভিল হান্ট চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি-কেও কার্যত এক ঘরে করে নির্বাচন নিয়ে টানবাহানা চালিয়ে যাচ্ছে ইউনূসের প্রশাসন। সেই সুযোগে বাংলাদেশে ইসলামী কট্টরপন্থী মৌলবাদের শিকড় যাতে আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে সেই ব্যাপারে সচেষ্ট জামায়তে ইসলামী এবং পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে সক্রিয় পাকিস্তান। ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, চট্টগ্রাম ও রংপুরে সবচেয়ে সক্রিয় পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। এই দুটি এলাকাই ভারতের জন্য বিপজ্জনক। পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া, তেমনই রংপুর ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর লাগোয়া। দুটিই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চিন্তার। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক একটা খবর ভারতের মাথাব্যাথা আরও বেড়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেটা হল বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার চিন সফর। সূত্রের খবর, আগামী ২৬ মার্চ তিনি চিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। চিন থেকে তাঁরা জাপান ও তাইল্যান্ড সফর করার কথা। ভারতের মাথাব্যাথার কারণ হল ইউনূসের চিন সফর। আরও জানা যাচ্ছে, বেজিং নাকি বিশেষ বিমান পাঠাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য। ফলে বোঝাই যাচ্ছে চিন বড় কোনও পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ নিয়ে। যা ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় কোনও হুমকি হতে পারে। ফলে ভারতের আর চুপ করে বসে থাকা উচিৎ হবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি পুরোই পাল্টে গিয়েছে বাংলাদেশে। যে দেশ দ্রুত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, জিডিপি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। বৈদশিক মুদ্রার আমদানি ভালোই হচ্ছিল আর বিদেশী লগ্নিও আসছিল। আচমকা সেই দেশই যেন সব হারানোর দেশে পরিণত হয়ে গেল বিগত সাত মাসে। বাংলাদেশে এখন চুরান্ত অরাজকতা গ্রাস করেছে। আইন-শৃঙ্খলা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। সে দেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। এখন মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক ভাষণে এই প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত তুলোধনা করেছেন মুহাম্মদ ইউনূসকে।
শুধু যে আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের আরেক রাজনৈতিক দল বিএনপিও মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতা ও লাগামছাড়া ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে। তাঁরাও ইউনূস সরকারকে তুলোধনা করতে ছাড়েনি। এখানেই শেষ নয়, সোমবার থেকেই আন্দোলনে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পডুয়াদের একটা অংশ। মঙ্গলবার ঢাকার রাস্তায় ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-নামের একটি প্ল্যাটফর্মের গণপদযাত্রার আয়োজন করেছিল। কিন্তু সেই গণপদযাত্রায় বাধা দিয়েছে পুলিশ। মিছিলকারীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। তখনই হাতাহাতি হয়। পুলিশের লাঠিপেটায় মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এতেই প্রমানিত নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ইউনূসের প্রশাসন দমনপীড়নের নীতিতেই অবিচল। উল্লেখ্য, দিন কয়েক আগেই ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হিংসা ও ধর্ষণ নিয়ে সরব হয়েছিলেন। বিশেষ করে যে হারে বাংলাদেশের তদারকি সরকার সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি ও খুনের আসামীদের জেল থেকে মুক্তি দিয়েছে, সেটা নিয়ে কড়া বিবৃতি দিয়েছিল নয়া দিল্লি। এখানেই উঠছে প্রশ্ন, এবার কি তবে অ্যাকশনে নামছে ভারত?
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এক বক্তৃতায় দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তিনি স্বীকার করেছিলেন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাস্তায় অপরাধীরা উন্মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে তাঁদের এত সাহস বেড়েছে এবং এত অপরাধ বেড়েছে।
বাইট – ওয়াকার উজ জামান, সেনাপ্রধান-বাংলাদেশ
বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত নাক গলায়নি, ভবিষ্যতেও নাক গলাবে না। কিন্তু ভারতের ওপর যদি ক্রমাগত হুমকি আসতে থাকে। এবং ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে ভারত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। যেমন মুহাম্মদ ইউনূসের চিন সফর। জানা যাচ্ছে, ওই সফরে মুহাম্মদ ইউনূস তিস্তা নদী বাঁধ প্রকল্প নিয়ে চিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এমনকি ওই প্রকল্প রূপায়নের জন্য চিনের সঙ্গে চুক্তিও করে আসতে পারেন। চিনও বহুদিন ধরে এই কাজ পেতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সেই আগ্রহে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার হাসিনা নেই, তাই চিনও উঠে পড়ে লেগেছে তিস্তা নদী বাঁধ প্রকল্প হাতে পেতে। এর আগে জামায়তে ইসলামী, বিএনপি নেতারাও চিন সফর করে এসেছিলেন। এবার যাচ্ছেন ইউনূস। ফলে ইউনূসের অবৈধ সরকার যাতে চিনের সঙ্গে চুক্তি সেরে না আসতে পারে, তার আগেই ইউনূসকে হঠাতে উদ্যোগী হতে পারে ভারত। সে ক্ষেত্রে ২৬ মার্চের আগেই ভারত অপারেশন মুহাম্মদ ইউনূস সেরে ফেলবে, যাতে মুহাম্মদ ইউনূস চিন হয়ে অন্যত্র পালাতে না পারেন। এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পুনর্বাসন দিয়ে দেবে। আর এই ব্যাপারে ভারতকে সাহায্য করবেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।












Discussion about this post