পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানবন্দরকে ফের চালু করার ঘোষণা আগেই করেছিল বাংলাদেশের সরকার। এবার সেই কাজ শুরু হচ্ছে। গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্যের একটি দল। জানা যাচ্ছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচকের তৈরি এই কমিটির হাতেই বিমানবন্দরের কারিগরি সম্ভাব্যতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি স্থাপনের উপযুক্ত স্থান চিহ্নিত করা হবে। এমনকি এই বিমান ঘাঁটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটির একটি হতে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন এই লালমনিরহাট বিমানবন্দর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপুর্ণ ? এই বিমানঘাঁটি নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্নের কারণ কী? লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটিতে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সম্ভবনা কতটুকু রয়েছে? ভারতকে কি টক্কর দিতে চাইছে? এমন নানা প্রশ্ন উঠে আসছে।
উত্তরা অঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। এর অবস্থা পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের মাঝামাঝি এলাকায়। জানা যায়, বাংলাদেশ আকাশাসীমার জন্য এই এলাকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত নিরাপত্তার কারণে দুই রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাতে নজরদারি জোরদার করেছে। এদিকে ঠিক সেই সময়, বাংলাদেশ তৎপর হল। ভারতের উদ্বেগের কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, ভারতের ডুয়ার্স থেকে দার্জিলিং এবং উত্তরে সিকিম পর্যন্ত লালমনিরহাট থেকে নজর রাখা অত্যন্ত সহজ এবং সম্ভব। এমনকি ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব।
জানা যায়, ১৯৩১ সালে লালমনিরহাট বিমান বন্দর তৈরি করে ব্রিটিশরা। ১ হাজার ১৬৬ একর জমির উপর এই বিমানঘাঁটি তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছিল মিত্রপক্ষ। একটা সময় দক্ষিণ এশিয়ার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ছিল লালমনিরহাট। এর রানওয়ের দৈঘ্য ৪ কিলোমিটার। কিন্তু সেটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এবার নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কাজও শুরু হয়েছে বলে খবর।এমনকি এর শুরুতেই রানওয়ের সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা হবে। হবে হ্যাঙ্গার, এবং কন্ট্রোল টাওয়ার। এছাড়াও একটি ড্রোন অপারেশন ঘাটিও তৈরি করা হবে। পাশাপাশি সেনাদের জন্য আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বিশেষ ক্ষেত্রে পরিচালনার যত একটি ভবন তৈরি করা হবে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশ সীমা ব্যবস্থাপনা মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক। তাই উত্তরা অঞ্চল থেকে যাতে নজরদারি চালানো যায় এবং আকাশ সীমার ক্ষেত্রে শক্তিশালী করা যায়, তাই এই ভাবনা সরকারের। মনে করা হচ্ছে, লালমনিরহাট বিমানবন্দর হলে বাংলাদেশ আঞ্চলি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
এদিকে ভারত উদ্বেগে রয়েছে, একদিকে সেভেন সিস্টার্স সহ ডুয়ার্স থেকে দার্জিলিং এবং উত্তরের বেশ কিছু জায়গায় নজরদারি চালাতে পারবে বাংলাদেশ। এমনকি ভারতের প্রাক্তন সেনা কর্তারা বলছেন, এই ঘাঁটি শুধু নজরদারি নয়, বাংলাদেশ চিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নতুন পর্যায় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি র্যাডার এবং চীনা প্রযুক্তি স্থাপিত হয়।
২০১৭ সালে ডকলামে মালভূমিতে চীন এবং ভারতের সেনাবাহিনী প্রায় ৭৩ দিন ধরে মুখোমুখি ছিল। সেই জায়গাটি ছিল ভারতের সেভেন সিস্টার্স থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে চীন চাইছিল ভারতের করিডোর প্রবেশের রাস্তা নির্মাণ করতে। কিন্তু ভারত তা হতে দেয়নি। আর এতেই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। সেখান থেকেই ভারতের সবথেকে সংবেদন জায়গা এই চিকেনস নেক বা সেভেন সিস্টাস। এখন এই করিডরের দক্ষিণে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে তৈরি করছে একটি বিমান ঘাঁটি। যেটা স্বাভাবিকভাবেই ভারতের কাছে উদ্বেগের কারণ।
চীন বিশ্ব দরবারে নিজেদেরকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সামরিক কৌশল পোক্ত করছে। এতদিন তারা পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকাতে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে চিন। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা থাকা পর্যন্ত বাংলাদেশকে কুক্ষিগত করতে পারিনি চীন। কিন্তু এবার ধীরে ধীরে তারা পদ্মা পাড়ের দেশে আধিপত্য বিস্তার করছে। এই লালমনিরহাট বিমানবন্দরে চিন্স প্রযুক্তি এবং সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে বলে খবর। এদিকে চিন বিভিন্ন সময় ভারতের অরুণাচল প্রদেশের বেশ কিছু অংশ নিজেদের বলে দাবি করে। ফলে চাপ তো রয়েছেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের কৌশলে লালমনিরহাটে চীনের বিনিয়োগ খুব একটা নিশ্চিত নয়।












Discussion about this post