পাকিস্তান আর বাংলাদেশের গলাগলিতে গলার কাঁটা সেই ‘একাত্তর’। ইতিহাস বলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালির প্রাণ নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারবাহিনী। শুধুমাত্র এক রাতেই ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করেছিল পাক সেনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তার পর পার হয়েছে ৫৪ বছর। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনও পর্যায়েই ভালো হয়নি। এরপর আসল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এক গণঅভ্যুত্থানের জেরে গদি যায় শেখ হাসিনার, আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিএনপিও এই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করছে। বিগত এক বছরে ইউনূসের সরকারের আমলে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। শুধু সম্পর্ক স্থাপনই নয় ইদানিং রীতিমতো গলাগলি শুরু হয়েছে ঢাকা ও ইসলামাবাদের। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের উপ প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার। তিনি বৈঠক করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস ও বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। পাশাপাশি তিনি বৈঠক করেন জামাত-বিএনপির মতো বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রবিবার আরও একবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দার আরও স্পষ্ট করে দিলেন ১৯৭১-এ নিয়ে তাঁরা ক্ষমা চাইবেন না। ঢাকার বুকে দাঁড়িয়েই তাঁর দাবি, অতীতেই সব ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। নতুন করে আলোচনার সুযোগ নেই। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী যখন এই কথা বলেছেন তখন তাঁর পাশেই ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। প্রসঙ্গত ঢাকার এক অভিজাত হোটেলে দু’জনে বৈঠক করেন তারপর একটি চুক্তি ও চারটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষরের পর সাংবাদিক সম্মেলনে এই কথা বলেন পাক উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার।
পাক বিদেশমন্ত্রীর এহেন বক্তব্য শোনার পর কূটনীতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, ভারতকে কোণঠাসা করতে বাংলাদেশের বর্তমান অস্থায়ী সরকারের পাকিস্তান প্রেমে এবার বিরহের কালো ছায়া নেমে এল রবিবার। কারণ ইশাক দারের মন্তব্যের পর বাংলাদেশে প্রবল সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেন। ফলে বাংলাদেশের মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের মুখে অনেকটা বাধ্য হয়েই পাকিস্তানের মনোভাবের বিরোধিতা করতে হয়েছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রককে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার জন্য ইসলামাবাদের ক্ষমা চাওয়া এবং দু’দেশের মধ্যে অন্য বকেয়া সমস্যাগুলি ‘এক বার নয়, এর আগে দু’বার’ মীমাংসা হয়ে গিয়েছে বলে রবিবার দাবি করেছিলেন ইশাক দার। তাই পাক মন্ত্রীর কথায়, ‘চ্যাপ্টার ইজ় ক্লোজ্ড’। এরপরই সাংবাদিকরা ছেকে ধরেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে। তাঁর কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, ইশাক দারের দাবির সঙ্গে আপনারা কি একমত? জবাবে স্পষ্টত বিব্রত তৌহিদ হোসেন বলেন, অবশ্যই একমত নই। তিনি আরও বলেন, আমরাও চাই বিষয়টির সমাধান হোক।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বস্তুত এই কারণেই শেখ হাসিনার সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির চেষ্টা করেছে। কিন্তু পাক উপপ্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যেভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট মুহাম্মদ ইউনূস সরকার এই বিষয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে নারাজ। কেবলমাত্র জনগণের ক্ষোভ প্রশমন করতে মৃদু প্রতিবাদ করা হয়েছে মাত্র। অনেকেই ভেবেছিলেন, ৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি নসাৎ করায় পাক উপপ্রধানমন্ত্রী ঢাকায় প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়বেন । কিন্তু তা তো হয়ইনি, বরং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বৈঠক করেছেন। ইশাক দার বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন রবিবার রাতে ইসলামাবাদ ফেরার আগে। বোঝাই যাচ্ছে, জামাত বা বিএনপি কেউই ইশাক দারের মন্তব্যের বিরোধিতা করেনি। উল্টে, অন্তর্বর্তী সরকার ও তাঁদের সহযোগী দলগুলি পাক বিদেশমন্ত্রীর আতিথেয়তায় কোনও খামতি রাখেনি। উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফে ইসলামাবাদকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল একাত্তরের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও যুদ্ধপূর্ব সম্পদের ন্যায্য অংশ ফেরত দিতে হবে। কিন্তু এবার যখন পাক বিদেশমন্ত্রী ঢাকায় এলেন, তখন প্রকাশ্যে সেই দাবি একবারও করলেন না বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এমনকি ইশাক দারের মন্তব্যের প্রতিবাদে সরকারিভাবে কোনও বিবৃতিও দেননি মুহাম্মদ ইউনূস। এর থেকে একটা বিষয় পরিস্কার, ভারতকে চাপে রাখতে পাকিস্তানের সঙ্গে যতই গলাগলি সম্পর্ক তৈরি করুক ইউনূস সরকার, গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে সেই একাত্তরের গণহত্যার ইতিহাস। যা উপরানো মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে সম্ভব না।












Discussion about this post