দু’দিনের জাপান সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর সেই সফরেই পহেলগাঁও হামলার তীব্র বিরোধিতা করল টোকিও। উদিত সূর্যের দেশ কড়া বার্তা দিল পাকিস্তানকে। সেই সঙ্গে জাপান জানিয়ে দিল, আগামী এক দশকে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছে তাঁরা। জাপান থেকে দু’দিনের চিন সফরেও যাবেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু তার আগেই জানা গেল, গত মার্চেই ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে এক গোপনীয় চিঠি পাঠিয়েছিল বেজিং। তাতেই দু-দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত ছিল। চিন সফরে নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও চিনের প্রেসিডেন্ট জিংপিনের সঙ্গে। সেই সঙ্গে একটা ত্রিপাক্ষিক বৈঠকও হওয়ার কথা। কিন্তু এরমধ্যেই চিন এক বিশেষ বার্তা দিল। ভারতের সঙ্গে চলা দ্বন্দ্ব দূরে ঠেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টক্কর দিতে নয়া দিল্লিকে পাশে চায় বেজিং। গত মার্চ থেকেই ভারত ও চিনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরু হয়েছে। কিন্তু চিনের মনোভাব নিয়ে নয়া দিল্লির সচিবালয়গুলিতে একটা সন্দেহের বাতাবরণ ছিল। কিন্তু ভারতীয় পণ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপাতেই ভারত পাশে পেতে চাইছে চিনকে। অপরদিকে রাশিয়া হল ভারতের অল ওয়েদার বন্ধু। সুসময় হোক বা দুঃসময় ভারত বরাবরই পাশে পেয়েছে ক্রেমলিনকে। আর এই তিন দেশ যদি একজোট হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে এই মুহূর্তে যারা ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি। রাশিয়া, ভারত ও চিনের জোট আরআইসি-র পুনর্জীবনের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যাবতীয় হুঁশিয়ারি, শুল্ক-বোমাকে উপেক্ষা করছেন, তাঁর ফোন ধরতেই অস্বীকার করছেন তাতে উৎসাহিত হয়েছে এশিয়ার বহু দেশ। আর প্রবলভাবে চাপে পড়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। কারণ ভারতের প্রতিবেশী এই দুই দেশের ওপর ভর করেই যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাগে আনতে চাইছেন। কিন্তু মোদি অনড়। এপ্রিলে পহেলগাঁও হামলা এবং মে মাসে ভারতীয় সেনার অপারেশন সিঁদুর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত পাকিস্তানের পাশেই দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়েও নাক গলাতে শুরু করেছে প্রবলভাবে। যা ভারতের নজর এড়ায়নি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। আইনের শাসন নেই বললেই চলে, নেই বাক স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও হরণ করেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসব দেখেও দেখছে না। তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ইউনূসের কাঁধে ভর করে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ হাতিয়ে নেওয়া এবং রাখাইন মানবিক করিডোরের মাধ্যমে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা। এটা যেমন ভারতের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে, তেমনই চিনের কাছেও খুব সংবেদনশীল। ফলে চিন ও ভারত একসাথে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আবার চালু হলে মার্কিন অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। এই শুল্ক-যুদ্ধের আবহেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটা বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, আগামীদিনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা পদে মুহাম্মদ ইউনূস না থাকলেও যাতে সে দেশে একটা পুতুল সরকার বসানো যায় সেই চেষ্টা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেন অংশ নেবে না, সেই প্রশ্ন সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। অথচ তাঁরাই গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ পুজারি বলে নিজেদের দাবি করে। অপরদিকে, ভারত ও চিনের লক্ষ্য থাকবে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার জন্য ইউনূসকে চাপ দেওয়া। এখন সকলেই তাঁকিয়ে এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে মোদি, পুতিন ও জিংপিনের বৈঠকের দিকে। বাংলাদেশ তো শেষ, নতুন করে গড়ার কি উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার।












Discussion about this post