বিগত এক বছরে বাংলাদেশ অনেক উত্থান পতনের ভেতর দিয়ে এসেছে। কিন্তু গত এক মাসে বাংলাদেশে যে গুমোট একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সেটা কি কোনও ঝড়ের পূর্বাভাস? বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীকে আড়াআড়ি বিভক্ত করার যে চেষ্টা বর্তমান প্রশাসন এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দল করে আসছে, তা অনেকটাই সফল বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। কেউ কেউ সরাসরি দাবি করছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এবং প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাইরে বেরিয়ে আসছে। জানা যাচ্ছে, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ১১ মে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানকে অপসারণ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টার দফতরে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস তাতে সই না করে আটকে রেথেছেন। এর ফলে সেনাবাহিনীর অন্দরেই একটা অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে রাখাইন “মানবিক করিডোর” ইস্যুতেও কার্যত দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে একটা বিপজ্জনক লক্ষণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
অপরদিকে নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাখাইন মানবিক করিডোর দেওয়া নিয়ে বিরোধিতা করায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের প্রতিও বিরক্ত বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তৌহিদ হোসের ছাড়াও উপদেষ্টামণ্ডলী এবং বাংলাদেশের কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলাও মানবিক করিডোর ইস্যুতে আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। জেনারেল ওয়াকার-সহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ মানবিক করিডোর ইস্যুতে অনড় মনোভাব নিয়েছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, যিনি আদতে মার্কিন নাগরিক, এই করিডোরের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। আবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যিনি মার্কিন ডিপ স্টেটের সহায়তায় বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছেন, তিনিও চাইছেন যেভাবেই হোক হুবহু মার্কিন প্রেস্ক্রিপশন মেনে ওয়াশিংটনকে মিয়ানমারের রাখাইন মানবিক করিডোর দিতে। তাঁদের সাহায্য করতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন দৌঁড়ঝাঁপ করছেন, বৈঠক করছেন ঘনঘন। জানা যায়, তিনি একাধিকবার আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কারণ ওয়াকার বিরোধী এই সেনা আধিকারিককেই প্রস্তাবিত মানবিক করিডোরের নন লিথাল বা অ-প্রাণঘাতী পণ্যর আসা যাওয়া পুরোটা নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বে আছেন। আর এটাই মেনে নিতে পারছেন না জেনারেল ওয়াকার এবং তাঁর দিকে থাকা সেনাবাহিনীর অন্যান্য শীর্ষ আধিকারিকরা। এও জানা যাচ্ছে, কামরুল হাসানকে অপসারণের জন্য তিনবাহিনীর প্রধানই একমত। সেই কারণেই কামরুল হাসানকে বরখাস্ত করেছেন জেনারেল ওয়াকার। কিন্তু পিএসও কামরুল হাসান বরখাস্ত হলেও প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে সরকারী প্রজ্ঞাপন না হওয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে সেনাসদরে। এও জানা যাচ্ছে, নতুন পিএসও হিসাবে নবম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মঈন খানের নাম প্রস্তাব করেছিলেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। যার গত আগস্টেই অবসর নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেনাপ্রধানের আস্থাভাজন এই সেনাকর্তার ফাইলে সই করেননি প্রধান উপদেষ্টা মুহা্মদ ইউনূস। যে কারণে তাঁকে অবসরে যেতে হয়, এবং শেষ পর্যন্ত নবম পদাতিক ডিভিশনে নিজের আস্থাভাজন এক সেনাকর্তাকে বসিয়ে দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এতেও ক্ষোভ বেড়েছে সেনাবাহিনীর অন্দরে। জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বাধীন করিডোর বিরোধী দলটি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে করিডোর চাইছে। যাতে মিয়ানমারে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ও অন্যান্য পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসকে গোপনে সমর্থন এবং অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতে পারে। যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। অন্যদিকে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান ও ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের একটা বড় অংশ মনে করছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিলিটারি অপারেশন জোন হিসাবে ঘোষণা করা উচিত। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-র ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই সব ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ভবিষ্যতে ভয়ানক রূপ নিতে পারে। যা নিয়ে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post