ইউনূসকে হটানোর দাবি এর আগেও তুলেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন এক ভাইরাল হওয়া একটি অডিও ক্লিপে তাঁকে এবার বাংলাদেশের নির্বাচন এবং মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে নুতন কিছু বলতে শোনা গেল। আলাদা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন করাতে হবে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের দ্বারা নিবন্ধন বাতিলের পর তাঁর মুথে নির্বাচন প্রসঙ্গ যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। হাসিনা বলছেন, কত বড় দুঃসাহস, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করেছে। আওয়ামী লীগ না থাকলে তো আজ দেশই স্বাধীন হতো না। পাশাপাশি তিনি বলেন, অবৈধ সরকারের সব নির্দেশই অবৈধ।
অর্থাৎ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল-সহ তাঁর বা তাঁর দলের বিরুদ্ধে যা যা নির্দেশিকা, মামলা জারি হয়েছে সবই অবৈধ। এ কথা বলাই যায়. হাসিনার দাবি অনুযায়ী তাঁর দল আসন্ন নির্বাচনে লড়বে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা এদিন যা যা বলেছেন তাতে চাপ বাড়বে মুহাম্মদ ইউনূসের। কারণ, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গণতন্ত্রের বেহাল দশা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলি প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। হাসিনা আজও নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, এবং ইউনূসকে অবৈধ্য দখলদার বলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি কূটনৈতিক মহলে একটা বার্তা দিতে চাইলেন। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল, যারা সে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহন করেছিল। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের কন্যা, তিনি দুর্নীতি করতে পারেন না। আর তিনি বাংলাদেশকে যে জায়গায় ছেড়ে এসেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে। আন্তর্জাতিক মহলকে আরও একটা বার্তা সুকৌশলে তিনি দিলেন, যে মুহাম্মদ ইউনূস নিজের আখেড় গুছিয়েছেন বিগত এক বছরে। বাংলাদেশের কোনও উন্নতি তিনি করেননি। সবমিলিয়ে এই প্রথমবার শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিপক্ষকে প্রবল চাপে ফেললেন। আর সেটা এমন একটা সময় করলেন, যখন আওয়ামী লীগ রাজধানী ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বহু শহরে ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচি করছে সরকারের যাবতীয় বাঁধা ও আপত্তি উড়িয়ে। ফলে এই মুহূর্তে ইউনূসের প্রশাসন আওয়ামী লীগের মিছিলগুলি কঠোরভাবে দমন করলে, বা মিছিল থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক মহলে বদনাম হবেন ইউনূস। আর ফায়দা লুটবেন শেখ হাসিনা।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অসহিষ্ণু মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার একে অপের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব নিয়েও চলছে। যেমন, একদিকে জামাত-এনসিপি তো অন্যদিকে বিএনপি। আবার বামদলগুলি এবং ছোটখাটো রাজনৈতিক দলগুলিও একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলছে। গত বছর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কয়েক মাস যে ছিল না, প্রতিটি দলের মধ্যে একটা একতা দেখা গিয়েছিল। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এই অনৈক্যতাই আওয়ামী লীগের পালে হাওয়া দিচ্ছে। সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে, গোটা বাংলাদেশে আওয়ামী সমর্থকই সবচেয়ে বেশি। তারপর বিএনপি। হাসিনা বিরোধী প্রচার ও আন্দোলনের প্রভাবে কিছু শতাংশ আওয়ামী সমর্থক হয়তো অন্যদিকে ঝুঁকে গিয়েছেন। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে ততই তাঁরা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছেন এই জামাত-এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপরীত পরিস্থিতিতে বহু আওয়ামী সমর্থক ও কর্মী বিপদ বুঝে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা এখন ধীরে ধীরে খাপ খুলছেন। তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করতে শেখ হাসিনার ভোকাল টনিকই যথেষ্ট, যা তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় অডিও ক্লিপের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। তিনি কেন ভিডিও বার্তা দেন না, এই প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বিদেশি শক্তিগুলি যেভাবে হাসিনা বিরোধী প্রচার করেছিল তাতে হাসিনার ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে। তাই তিনি সরাসরি সামনে আসছেন না। এখন প্রশ্ন হল, হাসিনা কিসের জোরে বলছেন, ইউনূসের সরকার নয়, অন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট হবে, এবং সেই ভোটে আওয়ামী লীগই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসবে। ২০২৬ সালেই আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আর সরকারে আওয়ামী লীগ।
কেউ কেউ বলছেন, আসলে তিনি অনেকটা নিশ্চিত হয়েই এটা বলছেন। কারণ, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাঁকে আস্বস্ত করছেন। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে শেথ হাসিনার জন্য জমি তৈরি করছেন ভারতীয় গুপ্তচররা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশেরই বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা এবং সুশীল সমাজের একটা অংশ এখনও আওয়ামী লীগের হয়ে প্রচার করে চলেছেন। আবার এটাও দাবি করা হচ্ছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ও সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ হাসিনাকে স্বমহিমায় ফেরাতে তৎপর। এছাড়া বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে এখনও আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ছায়া রয়ে গিয়েছে। কিন্তু যে কারণে হাসিনার দেশে ফেরা আরও সহজ হবে, সেটা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ইউনূসের মাথার উপর থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চালে কার্যত মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটাই হাসিনার ফেরার আগমণী বার্তা।












Discussion about this post