বাংলাদেশের অবস্থা এখন অনেকটা সেই ভাসমান কচুরিপানার মতো। যার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু শিকড় নেই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটা বিষয় চর্চা করছেন, সেটা হল বাংলাদেশের ক্ষমতা এই মুহূর্তে কার হাতে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুস, নাকি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। নাকি অন্য কোন অদৃশ্য শক্তি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ভাগ্য বিধাতা হয়ে বসে আছে। আসলে বাংলাদেশের অবস্থা এখন অনেকটা সেরকম ওই কচুরিপানার মতো। শিকড় নেই, তাই ভেসে আছে।
বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি মার্কিন ডিপ স্টেটের হাতের পুতুল বলেই পরিচিত। তার উপদেষ্টা মন্ডলের বেশ কয়েকজন সদস্য বিদেশী নাগরিক। গত বছর যে গণঅভুত্থান হয়েছিল বাংলাদেশে, সেটা ছিল এক মেটিকুলাস ডিজাইন। যা বাংলাদেশের বাইরে রচিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশের ভিতরে কয়েকটি গোষ্ঠী সেটাকে রূপ দিয়েছিল। এই গুষ্টি গুলির মধ্যে অন্যতম জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ বা হিজবুত তাহেরির মত কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন। আরো বেশ কয়েকটি ইসলামিক সংগঠন এই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। তাদেরই সম্মিলিত মুখ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এই গোষ্ঠীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কট্টর ইসলামিক সংগঠনগুলির উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাদেশে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এদেরকেই কাজে লাগিয়েছিল মার্কিন ডিপস্টেট নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে। বিনিয়োগ করা হয়েছিল মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। উদ্দেশ্য একটাই বঙ্গোপসাগরে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ভারত ও চিনের প্রভাব ইন্দো প্যাসিফিক রিজিয়নে কমানো যায়। এই লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই সফল বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা, ফলে অভ্যুত্থানের এক বছরের পর মার্কিন প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
আর এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জামাত-সহ বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলি নিজেদের কর্তৃত্ব আরও বৃদ্ধি করতে সক্রিয় হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ঢাকা রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জামাতের ইসলামিক ছাত্র শিবিরের জয়জয়কার। এই একটি ঘটনায় বুঝিয়ে দেয় বাংলাদেশের এই মুহূর্তে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক জামাত শিবির। মুহাম্মদ ইউনূস কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান তার ক্ষমতা বা টিকি অন্য জায়গায় বাঁধা আছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, গত বছর ৫ আগস্ট যিনি গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পালন করেনি, ছাত্র বিক্ষোভ ঢাকাতে তারা অস্বীকার করেছিল। ফলে খুব সহজেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। জানা যায় জেনারেল ওয়াকার শেষ মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে গিয়ে বলেছিলেন আপনাকে চলে যেতে হবে। তিনি হাসিনাকে সেফ এক্সিটের ব্যবস্থা করে দেন। আজও শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে। জেনারেল ওয়াকার গত বছর ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছিলেন আজ থেকে বাংলাদেশের জনগণের দায়িত্ব তার কাঁধে। তার সেই কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন বাংলাদেশের জনগণ। কিন্তু ১৫ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও জেনারেল ওয়াকার তার দাবির এক ফোঁটাও রক্ষা করতে পারেননি। আজ পরিস্থিতি এমনই, তিনি নিজেই কোন এক ক্যান্টনমেন্টের নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রয়েছেন। অথবা তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। কোনটা ঠিক কেউ বলতে পারছে না, কিন্তু জেনারেল ওয়াকারের অন্তরধান রহস্য আরও বাড়িয়েছে। একটা বিশেষ স্পষ্ট এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ নেই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের।
বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে যখনই কোন রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে তখনই দেখা গিয়েছে সেনা নিয়ন্ত্রিত এক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পালা বদলের পর যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৮ আগস্ট শপথ নেয় সেখানেও জেনারেল ওয়াকার বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। মনে করা হয়েছিল এটাও সেনা নিয়ন্ত্রিত কোন এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতই হবে। কিন্তু তা হয়নি। কারণ এবারে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পশ্চিমা শক্তি গুলি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে। পুরো বিষয়টি এতটাই সুচারুরূপে পরিচালিত হয়েছে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও অজান্তেই এই ব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ফলে আজ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার সেনাবাহিনীর মধ্যেই তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশের সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসও এই মুহূর্তে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা নিতে পারছেন না। তাহলে সরকার চালাচ্ছে কে? এটাই হলো সবচেয়ে চিন্তাকর্ষক প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ প্রশাসন আজ দেশের বাইরে থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূস বা তাঁর অন্তর্বর্তী সরকার, আবার বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার, কারোর হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা নেই। এই ক্ষমতা গুলি ভাগ হয়ে গিয়েছে কয়েকটি পকেটে। প্রথমেই বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাঁরা তাদের কাঙ্খিত সামরিক ঘাঁটি সম্ভবত অনেকটাই তৈরি করে ফেলেছেন বাংলাদেশের কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটাই লক্ষ্য ভারতের সঙ্গে পুনরায় বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা। সম্প্রতি মিশরে গাঁজা পুনর্গঠন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের কোন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ভারত একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়ে আমন্ত্রণ রক্ষা করেছে। কিন্তু মিশরের সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহাবাদ শরীফ কে পাশে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিজের বন্ধু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন সেই ভিডিও আর সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং।












Discussion about this post