এই মুহূর্তে বিশ্ব বাণিজ্যের সামুদ্রিক রুটগুলির মধ্যে একমাত্র বঙ্গোপসাগরেই মার্কিন আধিপত্য নেই। এমনকি চিনও এই অঞ্চলে খুব একটা ঘেঁষতে পারে না। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগীয় এলাকায় একমাত্র ভারতের আধিপত্য ছিল এতদিন। কিন্তু গত বছর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিদায় এবং মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষমতালাভের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি অনেকটা পাল্টে গিয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিজেদের অস্তিত্ব কায়েম করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অতি উৎসাহী। সেই সঙ্গে চিনও বঙ্গোপসাগরে তাঁদের নজরদারি বাড়িয়েছে। আর সবটাই হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে শিথিলতা আসার পর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে মার্কিন গতিবিধি বাড়তেই চিন কার্যত ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই অঞ্চলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি নির্মান করা। বিগত জো বাইডেন প্রশাসন শেখ হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করছিল বাংলাদেশের দক্ষিণপ্রান্তে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি পাওয়ার জন্য। কিন্তু হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্ব হারাতে নারাজ ছিলেন। দাবি করা হয়, ভারত ও চিনের পরামর্শেই তিনি মার্কিন দাবি অগ্রাহ্য করছিলেন। যদিও তাঁর পরিণতি মারাত্মক হয় হাসিনার পক্ষে। গদিচ্যুত হন তিনি এক ভয়ানক মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে। যার নিয়ন্ত্রক ছিল মার্কিন ডিপ স্টেট ও পাকিস্তানের আইএসআই। এর পর মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে মার্কিন আধিপত্য বাড়তে থাকে। আর পাক সেনা ও গুপ্তচর সংস্থা জামাতের হাত ধরে বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে শুরু করে। যদিও বাংলাদেশে মার্কিন আধিপত্যকে কড়া নজরে রাখতে শুরু করেছিল চিন। কারণ, যদি সেন্ট মার্টিন বা কক্সবাজারে মার্কিন ঘাঁটি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে সেটা চিন ও ভারতের পক্ষে হবে বিপজ্জনক। সেই লক্ষ্যেই বঙ্গোপসাগরে কড়া নজরদারি শুরু করেছে চিনা গুপ্তচর জাহাজ ও সাবমেরিন।
বিগত কয়েকমাসে ভারতীয় নৌসেনা এবং নজরদারি উপগ্রহ বেশ কয়েকটি রহস্যজনক সিগনাল পেয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায়। সেগুলি যে বাণিজ্যিক কোনও জাহাজ থেকে আসেনি, সে ব্যাপারে নিশ্চিত আধিকারিকরা। সেই সিগনাল কোনও সাবমেরিনের হতে পারে। একটি ফরাসি সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা বেশ কয়েকদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে একটি “লুকানো” চিনা জাহাজের উপস্থিতির খবর দিয়েছিল ভারতীয় নৌসেনাকে। সামুদ্রিক নজরদারি এবং ডোমেন সচেতনতার জন্য মহাকাশ-ভিত্তিক রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি সনাক্তকরণে বিশেষজ্ঞ ফরাসি কোম্পানিটি জানিয়েছে, চিনা গবেষণা জাহাজের উপস্থিতি। চিনা জাহাজটি ডার্ক মোডে ছিল। কিন্তু ফরাসি নজরদারি সংস্থা এবং ভারতের স্যাটেলাইটগুলি সেই জাহাজের সিগনাল ট্র্যাক করে নেয়। গত ১৪ মাসে চিনা কর্মকর্তারা বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের সাথে কমপক্ষে সাতটি উচ্চ-প্রোফাইল বৈঠক করেছেন। অপরদিকে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষদের সাথে ২২টি হাই-প্রোফাইল বৈঠক করেছেন। সেটা ভারতীয় গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি।
যদিও বিশ্লেষকদের একটা অংশ মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু করলেন। আর তাতেই পাল্টে গিয়েছে ভূ-রাজনৈতিক চিত্র। এই আবহে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় চিন ভারতের কাছাকাছি চলে এসেছে। এই তিন দেশের অক্ষ বুঝতে পেরেছে মার্কিন আধিপত্য রুখতে তাঁদের একযোগে কাজ করতে হবে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অদূরে মিয়ানমারের একটি দ্বীপ কোকো আইল্যান্ডে চিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে। এবার সেই কোকো আইল্যান্ডের খুব কাছেই ভারত একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে। সেখানে ভারত একটি গভীর সমুদ্র বন্দরও তৈরি করতে চলেছে। ফলে বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য বজায় রাখতে ভারত ও চিন এখন একযোগে কাজ করতে পারে। আর সেই কারণেই চিনা গবেষণা জাহাজ টহল দিচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। লক্ষ্য চট্টগ্রামে আসা মার্কিন জাহাজ বা মার্কিন গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর করা।












Discussion about this post