এক সাথে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছর ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসেন। সেই থেকে তিনি ভারতের আশ্রয়ে দিল্লির কোনও এক নিরাপদ স্থানে অজ্ঞাতবাসে রয়েছেন। ২০২৫ সালের ১২ মে তাঁর দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপণ জারি করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনকেও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আর আওয়ামী লীগের সোশ্যাল মিডিয়া প্যাটফর্মগুলিও নিষিদ্ধ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতদিন কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে গোপনে দলীয় কর্মী-নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। এবং মাঝেমধ্যে অডিও বার্তা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোনও গণমাধ্যমে বিগত ১৫ মাসে সাক্ষাৎকার দেননি শেখ হাসিনা। এই প্রথমবার তিনি মুখ খুললেন সংবাদমাধ্যমের সামনে, তাও আবার একাধিক আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দিক বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শেখ হাসিনা৷ এই তালিকায় যেমন রয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্স। তেমনই রয়েছে মার্কিন দৈনিক ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বা ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’। অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে, বিশ্বের তাবড় সংবাদ মাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার ফলাও করে প্রকাশ করেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, হাসিনা সেই নির্বাচনের আগে প্রবল চাপ সৃষ্টির কৌশল নিলেন। প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন করানোর চেষ্টা হলে বাংলাদেশের এক থেকে দেড় কোটি ভোটারের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। বিপুল সংখ্যাক আওয়ামী সমর্থকদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া মানে সেই নির্বাচন ‘অবৈধ’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা এবার অল আউট ঝাঁপানোর জন্য প্রস্তুত। তাঁদের আরও দাবি, এটা ভারতেরও এক কূটনৈতিক চাল।
নয়াদিল্লিতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা এই প্রথমবার কোনও গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন। মজার বিষয় হল, এএফপি এবং রয়টার্স এই দুই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থারই দাবি তাদের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে এই প্রথমবার সরাসরি কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। দুটি বার্তা সংস্থার সাক্ষাৎকারেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মোটামুটি এক। এএফপিকে তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগসহ সকল প্রধান দলের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না’৷ অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ নেত্রী বলেছেন, তাঁদের উপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায্য নয়, এটা আত্মঘাতীও। আবার ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরকার উৎখাতে ষড়যন্ত্রকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ হাসিনা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে দিন কয়েক আগে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি বাংলাদেশে সুষ্ঠ, অবাধ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি জনিয়ে বলেন, এতেই বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসবে। এবার প্রায় একই দাবি করলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। তবে তিনি এখানেই থেমে থাকেননি। কার্যত হুমকিই দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কার্যত এক ঢিলে তিন পাখি মারলেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যেমন তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি একটা আন্তর্জাতিক মঞ্চ তৈরি করলেন, তেমনই তাঁর দলকে নিষিদ্ধ করার দায় ঠেললেন সরাসরি মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিহিংসাপরায়ণতার দিকে। আবার জুলাই আগস্টের আন্দোলনের সময় হাজারের বেশি মৃত্যুর যে দাবি করা হচ্ছে, সেই সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করে শেখ হাসিনা পাল্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে রাজধর্মের পাঠ শেখালেন। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলিকেও বুঝিয়ে দিলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে করণীয় কর্তব্যই করেছিলেন সে সময়। ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে তিনি বলেন, “নেতা হিসেবে আমি চূড়ান্ত দায়িত্ব গ্রহণ করি, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া বা এমন ইচ্ছা করার দাবি সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর কথায়, রাষ্ট্রীয় আইনেই তারা জানেন কোন পরিস্থিতিতে কেমন পদক্ষেপ নিতে হয়। অর্থাৎ, সহিংস আন্দোলন দমন করায় নিরাপত্তাবাহিনী যা করার তাই করেছিল, এতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের যে প্রয়োজন হয় না, সেটাই তিনি বুঝিয়ে দিলেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্য কোনও দলকে সমর্থন করতে বলছি না’। এরপরই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে ভোট বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও আশা করি, সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনার জয় হবে এবং আমাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হবে’৷ অর্থাৎ, বল এবার আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় মুহাম্মদ ইউনূসের কোর্টেই ঠেলে দিলেন শেখ হাসিনা। যা আগামীদিনে ইউনূসের জন্য ভয়ানক এক দুঃস্বপ্ন হতে চলেছে।












Discussion about this post