বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যাকে গত বছর ৫ আগস্ট এক নাটকীয় গণঅভ্যুত্থানে গতিচ্যুত ও দেশছাড়া করা হয়েছিল। তিনি পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন, সেটা পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বারবার দাবি করলেও তাঁর পদত্যাগ পত্র দেখাতে পারেনি ইউনূস সরকার। এমনকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও স্বীকার করেছিলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তাঁর কাঁছে নেই। ফলে তিনি এখনও বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানমন্ত্রী। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনি ভারতের আশ্রয়ে কোনও এক অজ্ঞাতস্থানে রয়েছেন। বিগত কয়েকমাস শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলিতে অডিও বার্তা দিচ্ছেন। সেখানেই তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয় এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দায়মুক্তি নামে একটি অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত কথা বলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কোনও গণমাধ্যমে তাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে শোনা যায়নি বা দেখা যায়নি। এবার একটি নয়, একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী, তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা সম্ভব হয়েছে ভারতের গ্রীন সিগনাল পাওয়ার পরই।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ই-মেল মারফত নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ কয়েকটি বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। যা ফলাও করে ছেপেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা নিয়ে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল হবেন না। অর্থাৎ তিনি বাংলাদেশের জনগণ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট বয়কটের আহ্বান জানিয়ে দিলেন। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এটা হাসিনার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা হতে পারে, যা তিনি নিজস্ব চ্যানেলগুলির মাধ্যমে প্রচারও করে চলেছেন। যে আসন্ন নির্বাচন যদি ইউনূস সরকারের অধীনে হয় এবং আওয়ামী লীগকে তাতে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে যাতে একটা সার্বিক ভোট বয়কটের চিত্র ফুটে ওঠে। এবার কৌশলে তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানিয়ে দিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী। রয়টার্স হল বিশ্বব্যাপি প্রতিষ্ঠিত সংবাদ সংস্থা, তাঁদের খবর সমস্ত দেশের গণমাধ্যম গ্রহণ করে। ফলে রয়টার্সে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রচার হতে সময় লাগেনি। বিশ্বের বহু দেশের বহু নামী-দামী সংবাদমাধ্যম মুহূর্তে সেই খবর প্রকাশ করেছে। যা মুহাম্মদ ইউনূসের উপর নিঃসন্দেহে চাপ সৃষ্টি করবে।
রয়টার্সে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও মুখ খুলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তিনি বলেন, যে দলের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক, সেই সরকার আওয়ামী লীগকে স্বীকৃতি না-দিলে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন না। এটাও একটা চাপ সৃষ্টির প্রয়াস বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মুজিব কন্যার দাবি, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, এটি অসাংবিধানিক এবং আইনত অবৈধ। ইউনূসের উপর চাপ বাড়াতে তাঁর দাবি, কার্যকর স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাইলে এই কোটি কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। অন্যদিকে ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরকার উৎখাতে ষড়যন্ত্রকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে ইউনূস সরকারের আদালতে মৃত্যুদণ্ডের দাবিকে তিনি ‘ভুয়া বিচার’ বলে উড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। বিচার সম্পর্কে হাসিনা বলেছেন, এটি একটি ভুয়া আদালত, যা আমার রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন ও অনির্বাচিত-অসাংবিধানিক সরকার দ্বারা পরিচালিত। একটি দেশবিরোধী চক্র আমাকে নির্মূল করার চেষ্টা করছে, তবে কোনও কিছুতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পিছিয়ে আসবে না, লড়াই করে যাবে। পাশাপাশি তিনি কূটনৈতিক ভাষায় দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলিবর্ষণের নির্দেশ তিনি দেননি। হাসিনার কথায়, রাষ্ট্রীয় আইনেই তারা জানেন কোন পরিস্থিতিতে কেমন পদক্ষেপ নিতে হয়। এমনকি হাজারের উপর মানুষের মৃত্যুর দাবিকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, শেখ হাসিনাকে এবার স্বমহিমায় বাংলাদেশে ফেরানোর তোড়জোড় শুরু করে দিল নয়া দিল্লি। তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলিতে তাঁর মুখ খোলার রাস্তা করে দেওয়া। যাতে আওয়ামী নেত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের বক্তব্য ও অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। এর পরের খেলা খেলবে ভারত।












Discussion about this post