১৯৮৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের মাস তিনেক আগে দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। সেবার তাঁর অকাল প্রয়াণে শুধু কংগ্রেস নয়, আবেগে ভেসে গিয়েছিল গোটা দেশ। সেই নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ৪১৪টি আসনে জয়লাভ করেছিল। কংগ্রেসের এই ভূমিধস জয় দেখে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু এক স্মরণীয় মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মৃত ইন্দিরা জীবিত ইন্দিরা থেকেও বেশি ভয়ংকর’। মঙ্গলবার সকালে প্রয়াত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক সেনানায়ক তথা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী তথা সে দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাৎপর্যপূর্ণভাবে আর মাত্র মাস দেড়েক পর বাংলাদেশে বহু চর্চিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হতে চলেছে। যদিও সেই নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে কিনা সেটা এখনও অনিশ্চিৎ। তবে একটা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে, বেগম খালেদার মৃত্যু কি বিএনপির জন্য আশির্বাদ নিয়ে আসবে? তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে কি প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসাতে সক্ষম হবে?
গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে সমস্ত মামলার দায়মুক্তি দেওয়া হয়। একইভাবে তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও যাবতীয় দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে তো বটেই, বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও খালেদাকে নিয়ে আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও খালেদা জিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে ঘোষণা করেছিল। ফলে খালেদা জিয়ার মৃত্যু আসন্ন নির্বাচনে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। এদিকে আঠারো মাস কারাগারে এবং দীর্ঘ সতেরো বছর বিদেশে কাটানোর পর সশরীরে আবার বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে নেমেছেন তাঁর ছেলে তারেক রহমান। গ্রেফতারির ভয় এবং প্রাণের শঙ্কা মাথায় নিয়েই তিনি ঢাকায় ফিরেছেন। আর তাঁর ফেরার পরই বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলাদা একটা যোশ ফিরে আসে। এবার তাঁদের প্রিয় নেত্রীর মৃত্যু একটা আবেগের জায়গাও করে দিল। ফলে সময়মতো ভোট হলে বিএনপির বিপুল জয় প্রত্যাশিত। এখন দেখার বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়াত খালেদা জিয়ার স্মৃতি এবং তাঁকে ঘিরে আবেগ প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধির মতোই শক্তিশালী হয়ে ওঠে কিনা।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে গত দেড় বছর ধরেই তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর মা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য যখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন সেই অবস্থায় তাঁর বাংলাদেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। সেসময় তারেকের একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। তবে তিনি দেশে ফিরলেন, কিন্তু এমন একাট সময় যখন তাঁর মা প্রকৃতই মৃত্যু সয্যায়। মায়ের মৃত্যুর আবেগ ধরে তাঁর রাজনৈতিক গতিপথ এগোলেও এবার অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে তারেক রহমানের সামনে। তারেকের প্রথম চ্যালেঞ্জই হল তাঁর নিরাপত্তা। দেশে ফেরার পর থেকে বিএনপি এবং তিনি নিজেও জীবনের শঙ্কা নিয়ে চিন্তিত। ফলে তাঁকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ভোটে তাঁকে জনসংযোগ করা নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে এখানকার রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জও আছে। কেন তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে থাকলেন, কেন তিনি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করলেন না, এসব নিয়েও যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হতে হবে তারেক জিয়াকে। তেমনই আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে সেটি হল, লন্ডনে তাঁর আয়ের উৎস কি ছিল। এর কোনও সঠিক উত্তর এখনও নেই।
পাশাপাশি তারেক রহমানকে নতুন নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলাও করতে হবে। বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসেবে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নানা কৌশল নির্ধারণ বা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা যেমন তাঁকে করতে হবে। তেমনই বর্তমান বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধী পক্ষের সমালোচনা বা চাপ, কূটনৈতিক পর্যায়ে অবস্থান, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা, এমন বিভিন্ন বিষয় থাকবে। আর সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ সেটা হল, জামাতের উত্থানকে মোকাবিলা করা। এখন জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। ফলে জামাতকে টেক্কা দেওয়ার কৌশলও তাঁকে বের করতে হবে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post