আশির দশকের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরুষদের একচেটিয়া দখলে থাকা একটি বধ্যভূমি। সেখানে প্রথম নারীদের প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেই বধ্যভূমিতে নারীদের লড়াই করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনিই। এরপর আসরে নামেন শেখ হাসিনা, যিনি বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের কন্যা। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছিল এই দুই নারীকে কেন্দ্র করেই। কখনও তাঁদের রাজনৈতিক লড়াই ছাপিয়ে গিয়েছিল ব্যক্তিগত আক্রমণে, কখনও আবার ভোটের ময়দানে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের এই দুই নারীই কার্যত রাজনীতির ময়দান থেকে দূরে। বেগম জিয়ার প্রয়াণ হল, আর শেথ হাসিনা পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে। ফলে আর এই দুই নারীর লড়াই আর দেখবে না বাংলাদেশের জনগণ।
বলা হয়, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার উত্থান কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন ছিল না, ছিল ক্ষমতার ভাষা বদলে যাওয়া। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই দুই নারীর দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল অক্ষ হয়ে থেকেছে। সেই অক্ষ ভেঙে যাওয়ার অর্থ শুধু একজন নেত্রীর অনুপস্থিতি নয়, বরং রাজনৈতিক ভারসাম্যের পতন। ফলে আবারও বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে উঠবে পুরুষতান্ত্রিক। সে যাই হোক, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়েও কিন্তু উঠছে বিতর্ক। তাঁর মৃত্যুর দায় কার, সেটা নিয়ে কাঁটাছেঁড়া শুরু হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশে। যদিও শেখ হাসিনার আমলে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা খালেদা জিয়া জেলবন্দি ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অতীত শত্রুতা ভুলে শোকবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমনকি ২০০৪ সালে ঢাকার পথে সেই গ্রেনেড হামলার অতীত স্মৃতি দূরে সরিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনকে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ’ বলে উল্লেখ করছেন মুজিব কন্যা। এটা তো তাঁর সৌজন্যতা। কিন্তু খালেদার মৃত্যুর পর তাঁর বিরুদ্ধেও উঠেছে অভিযোগের আঙ্গুল।
প্রসঙ্গত, বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দু’টি মামলায় সাজা পেয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জেলে গিয়েছিলেন। তাঁর মোট ১৭ বছরের জেলের সাজা হয়। কিন্তু হাসিনার সরকারই এক অন্তর্বর্তী আদেশে তাঁর সাজা ২০২০ সালের ২৫ মার্চ স্থগিত করে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে গৃহবন্দি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর থেকে খালেদা জিয়া বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে স্বাধীনভাবে তাঁর যাতায়াতের উপর ছিল নানা বিধিনিষেধ। এরপর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেয় এবং খালেদা জিয়ার সাজা মকুব করে মুক্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়। এখন বলা হচ্ছে, হাসিনার আমলে তাঁকে জেলে রেখে দীর্ঘদিন মানসিক অত্যাচার চালিয়ে তাঁকে আরও অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি শারীরিকভাবে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তবে আরও একটি মত উঠে আসছে। চিকিৎসকদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং জীবনশঙ্কার তোয়াক্কা না করেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জে বেগম খালেদা জিয়াকে উপস্থিত করানো হয়েছিল। খালেদার মৃত্যুর পর এই বিষয়টি নিয়ে সে দেশের জনমানসে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে একপ্রকার জোরপূর্বকই তাঁকে সেই অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে নাকি কথা দেওয়া হয়েছিল, এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ভাষণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন। কিন্তু সেটা তো তিনি করেননি, উল্টে পরিকল্পিতভাবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খালেদা জিয়াকে ব্যবহার করেছিল। নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করতে এবং বিএনপি তাঁদের পাশে আছে, এমন কিছু কৃত্রিম বার্তা দেশবাসীকে দিতেই সরকার সেই ‘নির্মম নাটক’ সাজিয়েছিল। এদিকে চিকিৎসকদের আপত্তি সত্ত্বেও বেগম জিয়া ওই অনুষ্ঠানে হুইল চেয়ারে বসেই হাজির হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যখন নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা সংকটে ভুগছে, ঠিক তখনই বেগম জিয়ার অসুস্থতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এক নির্মম চিত্রনাট্য সাজিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এটাকে তাঁর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুপ্ত বাসনারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post