বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বুধবার কার্যত গোপনেই ওয়াশিংটন উড়ে গিয়েছিলেন। তখনও টের পায়নি বাংলাদেশি মিডিয়া। ভারতের গুটিকয় সংবাদ মাধ্যম যখন এই খবর প্রকাশ করল, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়। এরপরই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে জানানো হয় খলিলুর রহমানের মার্কিন সফরের বিষয়টি। জানানো হয়, বাণিজ্যক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে বৈঠক করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উড়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। জানা গিয়েছে ওই বৈঠকে অংশ নিয়েছেন দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তথা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরও। অর্থাৎ কেবলমাত্র বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক বিষয়ে নয়, এই সফর অন্য কোনও কারণে। সূত্র বলছে, খলিলুরকে তলব করা হয়েছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। যদিও আমেরিকার সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের একটি বৈঠক হয়েছে বলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের দাবি।
ঠিক কি হচ্ছে ওয়াশিংটনে? ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মনোভাব ও পরিকল্পনা কি সেটা যেমন তাঁরা জানবেন, তেমনই হোয়াইট হাউসের মতামত জানিয়ে দেওয়া হবে খলিলুর রহমানকে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আওয়ামী লিগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের উপর নানা মহল থেকে চাপ তৈরি হয়েছে। একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসেই শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একাধিকবার এই দাবি করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মার্কিন প্রবাসী শাখা সে দেশের একাধিক সাংসদ ও উচ্চপদস্থ কর্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ইউরোপীয়ো দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আওয়ামী লীগকে রাজনীতির আঙিনায় নিষিদ্ধ করা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অনেকে যেমন ইউ নূস সরকারকে সরাসরি চিঠি দিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে বলেছে, তেমনই ব্রিটেন সরাসরি ইউনূস সরকারের প্রতি ক্ষোভ ব্যক্ত করেছে। এছাড়া ইউরোপীয়ো ইউনিয়নও বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিয়ে সওয়াল করেছে। সবমিলিয়ে চাপ বাড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন মনে করছে আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে ভোট হলে নির্বাচনের পর দেশে বড় ধরনের অশান্তি তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও বিগত কয়েকদিন ধরে স্লোগান তুলছেন “নো বোট, নো ভোট”। অর্থাৎ আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা চিহ্নের কোনও প্রার্থী না থাকলে আওয়ামী সমর্থকরা যেন ভোট না দেন। জানা যাচ্ছে হাসিনার আহ্বানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে আশঙ্কার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটনে। সেই রিপোর্টেও এই আশঙ্কা জানানো হয়েছে। এরপরই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে জরুরি তলব করল ওয়াশিংটন।
জানা গিয়েছে, ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি মিস অ্যালিসন হুকার ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। সেখানে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, রোহিঙ্গা ইস্যু, ভিসা বন্ড এবং আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও কথা হয়। আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকারের সঙ্গে বৈঠকে খলিলুর রহমান আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানান। জবাবে অ্যালিসন হুকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। জানা গিয়েছে এই বৈঠকে খলিলুর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ চাল চালেন। তিনি গাজায় মোতায়েনের জন্য প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনীতে নীতিগতভাবে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারিকে। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, পাকিস্তানি গাজায় সেনা নিয়ে যেখানে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের সেনা পাঠানোর প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের মনে ধরবে। অন্যদিকে আলাদা বৈঠকে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট, মার্কিন ভিসা বন্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে সূত্রের খবর। জানা যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিচলিত। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বৃহত্তম সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবী করেছে শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই সে দেশে ১০ জন হিন্দু সম্প্রদায়িক হিংসার বলি হয়েছে। ৫০টির বেশি পরিবারের উপর হামলা, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এটা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পল কাপুর। এই বৈঠকে অংশ নেন দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তথা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর। ফলে এই বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। মনে করা হচ্ছে খুব শীঘ্রই বড় কোনও আপডেট সামনে আসবে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিষয়ে।












Discussion about this post