দীর্ঘকাল পর বাংলাদেশে এমন একটি সরকার গঠিত হতে চলেছে যেখানে আওয়ামী লীগ বিরোধী দল তো দূরের কথা কোনও চিত্রেই নেই। ফলে এই বিএনপি সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি। বিগত ১৮-১৯ মাসে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি বা অধ্যাদেশ জারি করেছে যা কিনা বেশ বিতর্কিত। ইউনুস সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। যেটাও এই নতুন সরকারের জন্য বিড়ম্বনার সামিল। ফলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের সামনে সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিভাবে ঢাকা ও নয়া দিল্লির মধ্যে সম্পর্কে উন্নতি করা যায়। অথবা ইউনূসের মতোই নয়া দিল্লিকে এড়িয়ে অন্যান্য দেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে তারেক রহমান তাঁর বিদেশনীতি পরিচালনা করবেন, সেটাও এখন দেখার। তবে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগে বেশ চাপে পড়েছেন। যেহেতু এখনও বাংলাদেশের ক্ষমতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেহেতু শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করার দায়িত্ব তাদেরই।
বাংলাদেশে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভারত ছাড়াও পাকিস্তান, চিন, মলদ্বীপ, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ব্রুনেই, কাতার, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং ভুটানের রাষ্ট্রপ্রধানকে। জানানো হয়েছে বিএনপি-র সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এই ১৩টি দেশের তালিকা প্রস্তুত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। যদিও ওই সময় দিল্লি ও মুম্বইতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ব্যস্ত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই কারণে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, এমনটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। তার সঙ্গে ঢাকায় যাবেন ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি। কাহানি মে টুইস্ট এখানেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের বিদেশমন্ত্রী এর জয়শঙ্কর, যেভাবে ঢাকায় উড়ে গিয়ে সদ্য মাতৃহারা তারেক রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তা কূটনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সে সময় তিনি তারেকের হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত শোক বার্তা তুলে দিয়েছিলেন। মাত্র চার ঘণ্টার ওই সফরে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাতটুকু করেননি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট ছিল অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত এই সরকারকে ভারত সরকার মান্যতা না দিলেও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি’র প্রতি ভারতের আস্থা রয়েছে। যেমনটা ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটাই ছিল নরেন্দ্র মোদির একটা মাস্টারস্ট্রোক। ভারত যে বিএনপি’র পাশেও দাঁড়িয়েছে সেটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের আম জনতাকে। কিন্তু এবার তারেকের শপথ অনুষ্ঠানে মোদি বা জয়শঙ্কর কেউই যাচ্ছেন না।
কিন্তু যেটা জানা যাচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আমন্ত্রণপত্র নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তাঁকে ভারতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে। ঘটনাচক্রে, বাংলাদেশ নির্বাচনে তারেকের দল বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজিতে পোস্ট করে তারেক রহমানকে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর মোদি সরাসরি ফোন করেন তারেক রহমানকে। সেটাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। পাল্টা সৌজন্য দেখিয়েছিল বিএনপিও। জানা যাচ্ছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও তারেক রহমানকে ফোন করেন ও শুভেচ্ছা জানান। ফলে এখন দেখার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান প্রথম কোন দেশে সফর করেন। জানা যাচ্ছে, ঢাকায় নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ইতিমধ্যেই তারেক রহমানকে তাঁর দেশে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন। এবার ভারতের আমন্ত্রণ যাচ্ছে তারেকের হাতে। ফলে দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক প্রথম কোন দেশে যাবেন তা নিয়ে জল্পনা রয়েছেই। উল্লেখ্য দীর্ঘ শিথিলতার পর ভারত চাইছে দ্রুত দু-দেশের সম্পর্ক মেরামতি করতে। তাই, সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত করতেই প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারেক রহমান যাতে ভারত সফরে আসেন সে ব্যাপারে আগেভাগে তৎপর হয়েছে নয়াদিল্লি। কিন্তু এটাই এখন তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি কোন দেশে যান সেটাই কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই। ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর, বাংলাদেশ একটি নির্বাচিত সরকার আসতে চলেছে। যার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেবেন। শপথ নেওয়ার পর, তিনি প্রথম কোন দেশে সরকারি সফরে যান তা নিয়ে কৌতূহল অবশ্যই থাকবে। চিন, পাকিস্তান নাকি নিকট প্রতিবেশী ভারত? নাকি এই সাময়িক দ্বন্দ্ব পাশ কাটিয়ে তারেক রহমান মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিমা বিশ্বের কোন দেশে প্রথম সরকারের সফর করেন সেটাই দেখার। তবে ভারতের হাতে রয়েছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেটা হল গঙ্গাজল বন্টন চুক্তি, যা চলতি বছরে ডিসেম্বরে শেষ হবে। ফলে তারেক রহমানকে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতেই হবে এমনটাই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। গঙ্গা জল বন্টন চুক্তি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গলার কাঁটা, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই কাঁটা কিভাবে ওপড়ান, সেটাই এখন দেখার। কারণ ভারত যা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাল চেলে রেখেছে সেটা সামলাতেই তারেক রহমানকে যথেষ্ট কসরত করতে হবে। তারেক কী পারবেন সেই সাহস জোগাড় করতে?












Discussion about this post