এই রবিগানটি কমবেশি সকলের শোনা – “সহে না যাতনা / দিবস গনিয়া গনিয়া বিরলে / নিশিদিন বসে আছি শুধু পথ পানে চেয়ে- / সখা হে এলে না।”
এই গানের অন্তরাভাগে রয়েছে “ দেহে বল নাই, চোখে ঘুম নাই – / শুকায়ে গিয়াছে আঁখিজল /একে একে সব আশা ঝ’রে ঝ’রে প’ড়ে যায় – ।” প্রথমতো গানটি প্রেম পর্যায়ের। আর পাকিস্তানকে নিয়ে জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান যা বলেছেন, সেটা অনেকটাই যেন গানের দুখানুভুতির সঙ্গে বেশ মিলে যায়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘২৩ বছর পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে আমরা একসঙ্গে চলেছি। সে সময়টা যারা পশ্চিম পাকিস্তানের ছিলেন, তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে ইনসাফ পূর্ণ আচরণ করেননি। এই ডেসপারেটির বিরুদ্ধেরই একটা নিরব দ্রোহ ছিল সত্তরের নির্বাচন। পরবর্তীতে এ নির্বাচনের হাত ধরেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, অসংখ্য জীবনদান, বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে পুনরায় দ্বিতীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের জন্ম।’
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা এখন যে দেশটা … স্বাধীন দেশটা আহল্লার মেহেরবানিতে পেয়েছি, এটি একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিল। ৪৭- য়ে যারা যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে পাকিস্তান তৈরি করেছিলেন, তাঁরা অনেক ভালো কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই ভালো কথার প্রতিফলন জনগণ দেখেনি। তারপরেও ৪৭ যে পূর্ব পাকিস্তান ছিল এটাই বর্তমান বাংলাদেশের সীমানা। ওই সীমানা নিয়েই আমরা চলছি। কাজেই এটার ভিত রচনা হয়েছে ৪৭। আবার ৪৭-য়ের যারা সংগ্রামী ছিলেন, রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তাঁরা তাঁদের দায়িত্বটা নিষ্ঠার সাথে না পালন করার কারণেই পরবর্তী পর্যায়ে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাঁরা ফুঁসে উঠেছিল। ৭০-য়ের নির্বাচনে তার প্রতিফলন হয়েছিল। এই নির্বাচন অনুযায়ী ৭০ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল শান্তিপূর্ণভাবে। সেটি না হওয়ার কারণেই মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এবং সেই মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য জীবন চলে গিয়েছে। অসংখ্য মানুষ আহত, পঙ্গু হয়েছেন। যাঁরা অংশগ্রহণ করে যুদ্ধ করেছেন, যাঁরা চলে গেছেন, যারা আহত হয়েছিলেন, তাদের সকলের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ”
জামায়াত আমির আরও বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সংগ্রামের পেছনে কোনো এক ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ধরা উচিত নয়। বরং পুরো জাতি, বিপ্লবী জনগণই ইতিহাসে মাস্টারমাইন্ড। তিনি বলেন, “আজ পর্যন্ত আমরা এ পরিবর্তন, বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান যে ভাষায় বলি, তার কোনো ক্রেডিট দল হিসেবে দাবি করি না। এখানে বাংলাদেশের বিপ্লবী জনগণ, সবাইমিলে আমরা মাস্টারমাইন্ড।” ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “১৯০ বছরের শোষণমূলক দাসত্বের জিঞ্জির ছিঁড়ে উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা কখনোই ন্যায্য আচরণ করেননি। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের নীরব প্রতিরোধই স্বাধীনতার প্রথম ধাপ। পরে, সত্তরের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।”
তাঁর এই বক্তব্য যে কতটা স্ববিরোধী সেটা বোঝা যাবে গত বছর ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল ভোটের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর দলের সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তারেক রহমান বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জামায়াত কোনও নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে থাকতে আগ্রহী নয় বরং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় নিজ কার্যালয়ে বসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেছেন,আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হলে এককভাবে নয়, বরং বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মূলধারার রাজনীতিতে ফেরা দলটি এরই মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনাও শুরু করেছে।












Discussion about this post