শান্তির জন্য নোবেলজয়ী তথা প্ৰখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন দেড় বছরের বেশি সময়। কিন্তু তাঁর বিদায়ের পর যেন মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহবুদ্দিন চুপ্পু। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি পূর্ববর্তী প্রশাসক মুহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি তোলপাড়। কেন এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হল? ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে কেন এত ক্ষোভ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর?
আসলেই এই ক্ষোভটা স্বাভাবিক, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শপথ নিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টামন্ডলী। তারপর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কিভাবে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান রক্ষা করেছেন তার বিবরণ দিয়েছেন কালের কন্ঠে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে। সেখানেই তিনি বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন, সংবিধানের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঠিক তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক চুক্তি করেছিল ইউনুসের সরকার। বলা হচ্ছে এই চুক্তি বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকের শামিল। বর্তমান তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার যথেষ্ট বিড়ম্বরের মধ্যে পড়ে আছে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। আমরা জানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তারেক রহমানকে চিঠি লিখে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো প্রথম চিঠিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছিলেন আশা করি ব্যবসাক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করবেন! অর্থাৎ, প্রথম চিঠিতেই ‘কাজের কথা’ সেরে রাখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগেই ওয়াশিংটনে গিয়ে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। যা নিয়ে এখনও বাংলাদেশ জুড়ে চলছে প্রবল বিতর্ক। আসলে তারেক রহমানকে নতুন দায়িত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাতেই তিনি তারেককে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ওই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানে বাংলাদেশের এক অনির্বাচিত সরকার তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এখন বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। তাঁরা চাইলে আগের অনির্বাচিত সরকারের করা চুক্তি বাতিল করতেই পারে এবং নতুন করে চুক্তির প্রস্তাব দিতেই পারে। এটাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। গণতন্ত্রের ধামাধারী আমেরিকা পরিকল্পিতভাবেই বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাজে লাগিয়ে দুটি চুক্তি করে রেখেছেন। তাই এখন সরকার পরিবর্তনের পর নির্বাচিত সরকারকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রাখলেন ট্রাম্প। ফলে তারেক রহমানের কাছে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে তারেক রহমানের নতুন সরকার অনেকটাই ভারতপন্থী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
প্রথম সিদ্ধান্ত –
প্রথমেই উল্লেথ করা যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রয়োজনীয় রদবদল। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের “অপেক্ষারত রাষ্ট্রদূত” হিসেবে বিদায় জানানো হয়েছে। এই সেনা আধিকারিক বিগত ইউনূস জমানায় প্রবল ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলেন। এবং পাকিস্তান ও চিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগও ছিল। তাঁকে সেনাবাহিনী থেকেই সরিয়ে দিয়ে বড় বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি আরও সাতটি বদলি ও পদোন্নতি কার্যকর করে বিএনপি সরকার মূলত নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। যিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এবার খলিলুর রহমানকে কার্যত তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই কাজ করতে হবে। আর সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাপন্থীদের সামনের সারিতে নিয়ে আসা হয়েছে।
দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত –
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপির সাংসদ সদস্যরা। এতে গণভোট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রাস্তা কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
তৃতীয় সিদ্ধান্ত –
ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল বা আইটিসি-র চিফ প্রসিকিউটরের মতো স্পর্শকাতর পদে পরিবর্তন এনেছে বিএনপি সরকার। জামায়াতে ইসলামির ঘনিষ্ট চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে বিএনপিপন্থী আইনজীবী আমিনুল ইসলামকে এই পদে নিয়োগ করেছে সরকার। তিনি আবার আওয়ামী লীগের প্রতি সংবেদনশীল বলেই জানা যায়। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যে সব মামলা হয়েছে, সেগুলি আবার যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এতে আওয়ামী লীগের সুবিধা হবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
চতুর্থ সিদ্ধান্ত –
বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ পদে রদবদল করে পুলিশকে ফের কার্যকরী করার পথে এগিয়ে যেতে চাইছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন আগামী ১২ মার্চ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। তখনই এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
সবমিলিয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত নতুন করে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। যার বহু নিদর্শন দেখা যাচ্ছে। তারেক নিজে এবং তাঁর মন্ত্রিসভাও ভারতকে নানা বার্তা দিচ্ছে। ফলে মুহাম্মদ ইউনূস এখন কোনঠাসা, জানা যাচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে যে কোনও মুহূর্তে তদন্ত শুরু হতে পারে। তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আগামীদিনে আরও বড় কিছু সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।












Discussion about this post