গত ১৭ বছরে বিএনপির নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পল্টনে দলের কার্যালয়ে সামনে চেয়ার পেতে বসে থাকা রূহুল কবির রিজভি কিম্বা মির্জা ফখরুলরা পড়েছিলেন যেন মাটি কামড়ে। যে কণ্ঠ একাই আওয়ামী লীগকে ধসিয়ে দিত বারবার, গণমাধ্যমে বিএনপির কথা বলে বলে দলটার নাম জনমনে জারি রাখত, সেই নামটি হল রুমিন ফারহানা। কিন্তু পরে দেখা গেল কোনও এক রহস্যজনক কারণে দলে এখন তিনি ব্রাত্য। এখন সোশ্যাল মিডিয়া ছয়লাব। আওয়ামী লীগে তিনি যোগ দিতে পারেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আসলেই কি ঘটনা সত্য? না কি এর পিছনে রয়েছ অন্য কোনও ঘটনা? রুমিন ফারাহানার বাবা অলি আহাদ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। তিনি আবার ভাষা সৈনিক। বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতা দিবসে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের আত্মপ্রকাশ তাঁর হাত ধরে। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলিগ এবং আওয়ামী মুসলিম লিগ অর্থাৎ বর্তমান আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ৫২য়ের ভাষা আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের জন্য ঘাম ঝড়িয়েছেন। শেষে দলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির জেরে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরবর্তীতে তিনি মতাদর্শগত কারণে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যান। নিজের রাজনৈতিক পথ বেছে নেন। রুমিন ফারহানা তাই করলেন সেদিন। বাবার মতো তিনি তাঁর পথ বেছে নিলেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি, ভাষা দিবসের দিন শহিদ মিনারে গিয়েছিলেন রুমিন ফারহানা। তাকে শ্রদ্ধার্পণ করতে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে তাঁর পুরনো দলের বিপক্ষেই। যে দলের জন্য একসময় জান লড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই বিএনপির তরফে তাকে প্রবল বাধা দেওয়া হয়। প্রশ্ন উঠেছে তারেক রহমানের মবের দিন শেষ – এই কথা কি শুধুই কথার কথা?
ওই ঘটনায় রুমিন ফারহানা যে কষ্ট পেয়েছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি একজন ভাষা সৈনিকের কন্যা। তবে গত কয়েকমাস ধরেই রুমিন কিন্তু নানা ভাবে কষ্ট আর আঘাত পেয়ে এসেছেন। রুমিন তাঁর দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। নির্বাচনে যাতে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, তার জন্য বিএনপির থেকে প্রবলভাবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এত বাধার পরেও কিন্তু তাকে কেউ প্রতিহত করতে পারেনি। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রুমিনের প্রতীক ছিল হাঁস। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে কথা বলতে। “খুলনা থেকে রাজশাহী বিদেশ বানিয়ে ফেলেছে আওয়ামী লীগ” কিম্বা “ আওয়ামী লীগ এখন মজলুম। তাদের পাশে থাকাই সমীচিন ”- ইত্যাদি বলে কেমন যেন এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন জনমানসে। প্রশ্নটি হল রুমিন ফারহানা কী তবে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা সৈনিকের মেয়ের আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রথম দর্শনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও রাজনীতির মাঠে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়, বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। যখন রুমিন ফারহানা তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল বিএনপির সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি করেছেন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে নিজের জনসমর্থন প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের পথ খোলাই থাকছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য, যেখানে তিনি আওয়ামী লীগের আমলের দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন বা দলটির বর্তমান কোণঠাসা অবস্থাকে মজলুম হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। এটি কেবল পুরনো দলের প্রতি অভিমান না কি নতুন কোনও সমীকরণের সুক্ষ্ম ইঙ্গিত ? রাজনৈতিক অঙ্গনে এই নিয়ে জোর চর্চা চলছে।
রাজনীতিতে টাইমিং এবং ন্যারেটিভ খুব গুরুত্বপূর্ণ। রুমিন ফারহানা সেই টাইমিংয়ের অপেক্ষাতেই আছেন। তার মতে একজন তুখর বক্তা, আইনের মানুষ, সর্বোপরি তাঁর জনপ্রিয়তা। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বড়ো ধরনের ভূমিকম্প হবে। এই সম্ভাবনা বিষয়টি একন গুঞ্জন হিসেবে ভাসলেও পর্দার আড়ালে দেনদরবার অনেক সময় অবিশ্বাস্য বাস্তবের জন্ম দেয়। যদি সত্যি এমন কোনও রাজনৈতিক অঘটন ঘটে গেলে বাবার স্মৃতিবিজরিত দলে ফেরা হিসেবেও আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।












Discussion about this post