তাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককের পরে এ বার মায়ানমারের সামরিক জুন্টা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন আং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের পড়শি এই দেশে সামরিক শাসন চলছে ২০২০ সাল থেকে। এর পর থেকে মিয়ামনারে কয়েকটি সশস্ত্র নিদ্রোহী গোষ্ঠী গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে লড়াই করছিল। যার মধ্যে অন্যতম আরাকান আর্মি। তাঁদের সম্মিলিত লড়াইয়ে কার্যত কোনঠাসা সামরিক জুন্টা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন আং হ্লাইংয়ের সরকার। সেই সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ। ফলে তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসে মিয়ানমারে নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছেন। চিনে ইসসিও সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের সেনা শাসককে নির্বাচনের জন্য যাবতীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উল্টোদিকে মিয়ানমারের সমস্যা সমাধান করে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগে ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশংসা করেন সেনা শাসক জেনারেল মিন আং হ্লাইং। কূটনৈতিক মহলের দাবি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসলে বার্তা দিলেন বাংলাদেশকে। ভারতের পড়শি বাংলাদেশেও গণতন্ত্র এই মুহূর্তে ভুলুন্ঠিত। সেখানেও গণতন্ত্র ফেরাতে ভারত বারবার সুষ্ঠ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার নির্বাচন নিয়ে নানান টালবাহানা করে চলেছে। চিনের মাটিতে মিয়ানমার সামরিক সরকারের প্রধানের সঙ্গে সে দেশের নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করে নরেন্দ্র মোদি বুঝিয়ে দিলেন, তিনি প্রয়োজনে বাংলাদেশের নির্বাচনেও নাক গলাতে পারেন। বিশেষ করে যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করানোর চেষ্টা করে ইউনূস সরকার। তাহলে ভারত ব্যবস্থা নেবে।
গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে বিগত এক বছরে গণতন্ত্রের নামমাত্র নেই বাংলাদেশে। সে দেশে সংখ্যালঘুদের উপর যেমন অত্যাচার ও লুটতরাজ চলছে, তেমনই মব জাস্টিসের নামে আওয়ামী লীগ ও সরকারবিরোধীদের হেনস্থা, মারধর ও গণধোলাইয়ের মতো অপরাধ বুক ফুলিয়ে চলছে। ভারত, বিগত এক বছরে বারবার মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারকে এই সমস্ত বিষয় ঠিক করার আর্জি জানিয়ে এসেছে। কিন্তু ইউনূস এবং তাঁর দোসররা ভারতের আর্জি কানেই তোলেনি, পাল্টা ভারতকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে এসেছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ইউনূস সাহেব আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নির্বাচন করানোর ব্যাপারে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু পারিপার্শিক পরিস্থিতি বিচার করে এবং সরকারের মনোভাব উপলব্ধি করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই মনে করছেন, আদৌ ওই সময়ে নির্বাচন করাবেন না মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার নানান ফন্দি-ফিকির আঁটছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।
ঠিক এই আবহেই চিনের মাটিতে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন সামিট উপলক্ষ্যে সামিল হয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার তাবড় রাষ্ট্রপ্রধানরা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিন তো ছিলেনই পাশাপাশি ছিলেন আরও বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। এই মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ধাক্কা সামলানোর উপায় হিসেবেও যেমন কাজে লাগালেন, তেমনই দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য ঠেকানোর চেষ্টায় একজোট করেছেন রাশিয়া ও চিনকে। সূত্রের খবর, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে তা নিয়ে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে একপ্রস্ত আলোচনা করেছেন মোদি। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণপ্রান্তে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন বেসক্যাম্প তৈরি এবং কক্সবাজার দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মির জন্য সহায়তা করিডোর ইস্যুতে একজোট হচ্ছে রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চিন। মিয়ানমারের সেনা শাসক জেনারেল মিন আং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও কী মার্কিন প্রভাব নিয়ে কথা হল নরেন্দ্র মোদির। হলে আশ্চর্যের কিছু হবে না। কারণ, মিয়ানমারে ভারত ও চিনের স্বার্থ রয়েছে, দুই দেশই মিয়ানমারে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করে ইকোনমিক করিডোর করেছে। আবার ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের যে কর্তৃত্ব হয়েছে, সেন্ট মার্টিনে মার্কিন বেস হলে তা বিনিষ্ট হবে। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে ছেঁটে ফেলে আওয়ামী লীগের মতো ভারত-চিন বন্ধু সরকারকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসাতে পারলে দুই দেশেরই লাভ। এটা এসসিও সম্মেলনেই বেজিংকে বুঝিয়ে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি। এবার অ্যাকশন নেওয়ার পালা নয়া দিল্লির।












Discussion about this post