রবীন্দ্রনাথ তাঁর “মহাবিশ্বে, মহাকাশে মহাকাল-মাঝে” গানের এক জায়গায় লিখছেন “ অনন্ত এ দেশকালে, অগন্য এক দীপ্ত লোকে, তুমি আছ মোরে চাহি- আমি চাহি তোমা-পানে। স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর, এক তুমি তোমা-মাঝে, আমি একা নির্ভয়ে।।” মূলত এটি পূজাপর্যায়ের গান। কিন্তু এই প্রতিবেদনের শিরোনামের সঙ্গে গানের কথাগুলি বেশ মিলে যাচ্ছে। বিশেষ করে এই দুটি লাইন -“তুমি আছ মোরে চাহি, আমি, চাহি তোমা পানে”, আর “ এক তুমি তোমা মাঝে, আমি একা নির্ভয়ে। ”
আমরা সকলেই জেনে গিয়েছি যে খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কটি বিষয় “Talk of the town” হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে একেবারে প্রথম দিকে রয়েছে ড. খলিলুরের নিয়োগ। এক সময়ে তাঁকে মনে করা হত কট্টর ভারত বিদ্বেষী বা “India bitter”, তিনি এখন বাংলাদেশের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থেকে একেবারে সরাসরি তারেকে সরকারি রান্নাঘর, মানে ক্যাবিনেটে ঢুকে পড়া। এ যেন এক উল্কা গতিতে উত্থান। খলিলুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ হওয়া কী শুধুমাত্র রাজনৈতিক? না কি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। ভারত কি তাঁকে মেনে নেবে? খলিলুর রহমান কি তাঁর ভারত বিদ্বেষী মনোভাব ঝেড়ে ফেলতে পারবেন?
খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করায় খোদ বিএনপির মধ্যে এক আশ্চর্য বিস্ময় বলয় তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে তৈরি করেছে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের নীতি নির্ধারণ কমিটির আলোচনায় চায়ের কাপে ধুম উঠছে। অনেক নেতাই খলিলুরের নিয়োগ নিয়ে হতভম্ব। কারণ খুব পরিষ্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের তিনি নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। সেই সময় খলিলুরের পরিচয় ছিল ভারত-বিদ্বেষী নেতা। বিএনপি সেই সময় তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে তারেক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি ভিডিও এখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিউজ বর্তমান সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি। সেই ভিডিওতে দেখা যায় সালাহউদ্দিন আহমেদকে। তিনি খলিলুরের ইস্তফা দাবি করছেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় – “আপনার সরকারে একজন বিদেশি নাগরিককে আপনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন। আপনার কি সেই আক্কেলজ্ঞান নাই ? একজন বিদেশি নাগরিকের কাছে এই দেশের সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সংক্রান্ত রিপোর্টে প্রদান করবে কীভাবে ভাবলেন?”
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাখাইনে “মানবিক করিডোর” ইস্যুতে খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল বিএনপি। তাঁর নাগরিক প্রশ্নে বিতর্ক, জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল দফতরে “বিদেশি নাগরিক” নিয়োগের অভিযোগ – সব মিলিয়ে তাঁকে অপসারণের তারা দাবি তোলে। দলীয় নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বৈঠকে সরাসরি তাঁর পদত্যাগ চান। সমাজমাধ্যমে বিএনপির কয়েকজন সাংসদ ‘#KhalilMustGo’ প্রচার চালান।
অথচ সেই খলিলুর রহমান তারেকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বিএনপির পররাষ্ট্র নীতির প্রধান কাণ্ডারি। এখন প্রশ্ন হল। তারেক রহমান কেন এই ঝুঁকি নিলেন? বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক আবেগের বশবর্তী হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। নিয়োগ নিয়ে তিনি রীতিমতো হোমওয়ার্ক করেছিলেন। নিখুঁত হিসেবের এক ভূরাজনৈতিকচাল। খলিলুর রহমানের সঙ্গে পশ্চিম বিশ্বের বেশ ভালো যোগাযোগ রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির নাড়ি আর হৃদস্পন্দন ভালো করে বোঝার ক্ষমতা রাখেন খলিলুর। তাঁর এই সখ্যতাকে কাজে লাগাতে চায় এই নতুন সরকার। কিন্তু বড়ো কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত সম্পর্কে তাঁর ভাবমূর্তি। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বিএনপি সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। মার্কো রুবিও তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তারেককে চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে ভারতের গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম “Will Khalilur Rahman, once an India baiter, now turn an acolyte after power changes hands in Bangladesh? ”পত্রিকার দাবি অনুষাযী, খলিলুরকে নিয়ে দিল্লির এক ধরনের সংশয় দীর্ঘদিনের। তারেক রহমানের দায়িত্ব হবে যে কোনও মূল্যে এই সংশয়ের নিরসন ঘটানো।












Discussion about this post