বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আগামীদিনে আওয়ামী লীগের জন্য যথেষ্ট পরিসর তৈরি করে দেবেন, তার একটা ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। তারেক রহমান এই প্রথম যে তেমন ইঙ্গিত দিলেন, তা নয়। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তাকে এই একই বিষয়ে বলতে শোনা যায়। তাঁকে কখনও প্রশ্ন করা হয় – আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণাকে তিনি কী ভাবে দেখছেন ? বা আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো হাসিনার দিল্লি অবস্থানকেই তিনি এবং তাঁর দলীয় নেতৃত্ব কীভাবে দেখছে? এই সব প্রশ্নের তিনি একই রকম উত্তর দিয়েছেন। সেই সব উত্তরের মূল সুর – তিনি চাইছেন আওয়ামী লীগ জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফিরে আসুক। ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি এই বার্তা দিয়েছেন। বার্তা দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্দেশ্যেও। বার্তা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও। বাংলাদেশের রাজনৈতিকমহল বলছে, বিএনপির জন্য আওয়ামী লীগ বেশ নিরাপদ। আর জামায়াত ঠিক ততটাই ভয়ংকর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি আর আওয়ামী লীগ ভিন্ন বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দল হলেও দুইয়ের মধ্যে মিল কিন্তু এক জায়গায়। এই দুটি দল উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত ছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা আওয়ামী লীগের ফেরার পথ তৈরি করে দেবে। গত চলতি বছর জানুয়ারিতে Time Magazine – তারেক রহমানের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেই সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। তবে বলেছেন, রাজনীতিতে কোনও দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার তিনি পক্ষপাতি নন। তিনি এটা বিশ্বাস করেন না। এই বিষয়ে তাঁর একটা স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। তারেক যা বলেছেন, তাঁর বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় – “ কোনও দল নিষিদ্ধ নয়। আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না তার নিশ্চয়তা কী?” ২০২৪-য়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক বিভক্তি এবং চাপের সময়ে দোর্দন্ড প্রতাপে হাসনাতরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখনও কিন্তু বিএনপি তাঁর গণশক্তি নিয়ে বা তাঁর আওয়াজ এবং সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধ করে ফেলার দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেনি।বিএনপি তাদের অবস্থান পরিষ্কার ছিল। এমনকী ৭৫-য়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভয়াবহ প্রতিকূল পরিবেশেই কিন্তু আওয়ামী লীগ আবার পুনর্গঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামি, ছাত্র শিবির রাজনীতিতে ফিরে আসার অনুমোদন পায়। এমনকী গোলাম আজমের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিতকে পর্যন্ত রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। এই আদর্শিক অবস্থান কিন্তু জিয়ার আমল থেকেই। অর্থাৎ, বিএনপি কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষপাতি নয়। সকল মত ও পথের ব্যক্তিকে তারা রাজনীতি করতে দেয়। আওয়ামী প্রসঙ্গে তারেক রহমানের অবস্থান সেই দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখলে একেবারেই ব্যতিক্রমী নয়। তারেক রহমান জানেন, ২০২৪-য়ের অগাস্ট থেকে ২৫-য়ের ডিসেম্বরের তাঁর পা রাখার আগে পর্যন্ত তাঁর দলকে মাইনাস করে ফেলার একটা সর্বাত্মক চেষ্টা চলে। রাজপথে তো বলা হচ্ছিল, ফ্যাসবাদ বিদায় করেছি, এবার চাঁদাবাজকে বিদায় করব। চাঁদাবাজ মানে বোঝানো হয়েছে বিএনপিকে। হাসিনাকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তারেক রহমানকেও দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। বিএনপিকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করা হবে। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত এই ধরনের প্রচার চালানো হয়েছে।
সেই অবস্থায় তারেক রহমান জানেন, ২০০৭ থেকে যে বিএনপিকে কেন্দ্র করে যে একটা মাইনাস প্রক্রিয়া চলছে, তাতে বহু পক্ষকে বুঝিয়ে তাকে রীতিমতো একরকমের সমঝোতায় আসতে হয়েছে। বার্তা দিতে হয়েছে তার আমলে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অভিমুখ কী হবে। আর Time Magazine-কে দেওযা সাক্ষাৎকারে তারেক পরিষ্কার বলেছেন, তিনি চাইছেন দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক। ফিরে আসুক আইনের শাসন। তারেকের ভাষ্যে “Our first priority will be to ensure the rule of law,” says Rahman. “To make sure that people are safe on the street, safe to do business.”












Discussion about this post