বাংলাদেশে সেই সময় ক্ষমতায় তদারকি সরকার। সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়া একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে সালাহউদ্দিন আহমেদকে। তিনি খলিলুর রহমানের ইস্তফা দাবি করেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় – “আপনার সরকারে একজন বিদেশি নাগরিককে আপনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন। আপনার কি সেই আক্কেলজ্ঞান নাই ? একজন বিদেশি নাগরিকের কাছে এই দেশের সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সংক্রান্ত রিপোর্টে প্রদান করবে কীভাবে ভাবলেন?”
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই শোনা গেলে জনাব খলিলুর রহমান, নতুন সরকার অর্থাৎ বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এই নিয়ে দেশবাসী তো আশ্চর্যই। তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য খোদ বিএনপির শীর্ষনেতারা। চারদিক থেকে প্রশ্নবাণ – খলিলুর রহমানের মধ্যে এমনকী দেখা গেল, যার কারণে এই ইউনূস সরকারের এই আলোচিত উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করতে হল তারেক রহমানকে? খলিলুর রহমানকে যে দেশ নিয়ে বারে বারে প্যাঁচানো হয়েছে গত দেড় বছর, বিএনপির শপথের একদিন পরেই দেখা গেল সেই দেশের খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুভেচ্চা জানিয়ে বসলেন তারেক রহমানকে।
ক্ষমতার মসনদে বসে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা পাওয়া খুব সহজ কথা নয়। পৃথিবীর যে কোনও দেশের, যে কোনও নেতা এমন শুভেচ্ছা পেলে বর্তে যেতেন। কিন্তু বিএনপি মনে হয় এই ঘটনায় বেশি খুশি হতে পারছে না। কারণ, এই দুইদিনেই বড়ো প্রশ্ন উঠে গিয়েছে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে। পুরো মন্ত্রিসভা নয়। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে যে আলাপ শুরু হয়েছে, তাতে আবার কান না দিয়ে উপায় নেই আমজনতার। প্রশ্ন উঠছে, খলিলুর রহমানকে কেন প্রয়োজন হল বিএনপির? দেশে কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার মতো আর কোনও যোগ্য লোককে পাওয়া গেল না? বিএনপির জন্য খলিলুর রহমান কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?
নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান খলিলুর রহমান সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য হাজির করেছেন। খলিলুর সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, তাতে রহস্যের সমাধান অনেকটাই হয়ে যাওয়ার কথা। নাজমুল আহসান যা বলেছেন তার সারমর্ম হল, খলিলুর রহমান দু’বার এমন রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছেন। সেই সব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ পরিষ্কার করেছে। ২০০১ সালে তিনি ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সচিব। যাঁর তত্ত্বাধানে হওয়া নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের জয় পায়। সেই সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই সঙ্গে তৈরি হয় বিশ্বস্ততা। বছরের পর বছর ধরে সেই সম্পর্কগুলো নীরবে তিনি বজায় রেখেছেন।
দুই দশকের পর আবারও এক সংকটময় মুহূর্তে ইউনূস সরকারের হাত ধরে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। গত বছর যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে, তখন খলিলুর রহমানই লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠকের মধ্যস্থতা করেন। ওই বৈঠকেই ইউনূস প্রথমবারের মতো নির্বাচনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে রাজি হন। বৈঠকের আগে দুই পক্ষের মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে খলিলুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ইউনূস প্রশাসনের ভিতরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং উদ্যোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান খলিলুর। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেলেও তিনি কেবল মানবিক বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই ইস্যুতে কথিত অপপ্রচারের ঢেউ মোকাবিলায় তিনি এক কূটনীতিককে দিয়ে তিনি কৌশলগত প্রস্তাবনাও তৈরি করিয়েছিলেন। তাঁর কর্মতৎপরতা পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের ছায়াকে ম্লান করে দিয়েছে। তৌহিদ হোসেন যখন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলেন, খলিলুর রহমান তখন বার্মিজ আরাকান আর্মির কম্যান্ডার থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত নিজের নেটওয়ার্ক গডে তোলেন। ওয়াশিংটনে এক সফরে খলিলুর রহমান হোয়াটহাউজে ইলন মাস্কের সঙ্গে দেখা করেন। এর পর তিনি ইউনূসকে বাংলাদেশে স্টারলিংকের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত অনুমোদনের ব্যাপারে রাজি করান। ধারণা করা হয়, ট্রাম্প বলয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাণিজ্য সংক্রান্ত এক সরকারি বিবৃতিতে শেষ মুহূর্তে একটি লাইন জুড়ে দেওয়া হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে গাজায় সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে। এছাড়া মার্কিন তুলা আমদানির শর্তে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিকে শুল্কমুক্ত করবে। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবকে ঢাকায় আনার মূল কারিগর এই খলিলুর। তাই, তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে তারেক রহমান প্রতিদান দিলেন। সেই সঙ্গে দিলেন স্বীকৃতি।












Discussion about this post