একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর – হলে কী হয়, রামায়ণ তার সাক্ষী। বাংলাদেশের অবস্থা তার থেকেও সংকট জনক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সে দেশে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। গোদের ওপর বিষফোরা হয়ে দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। গরম এখনও সেভাবে পড়েনি। বিদ্যুৎ সংকটে আশঙ্কায় দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় যে প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের সব চেয়ে বড়ো বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুরের কী অবস্থা? তার আগে একবার ইতিহাসের আলোকে দেখা যাক এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে।
১৯৬১ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সেই সময়কার পাকিস্তান সরকার। ১৯৬৮ সাল নাগাদ জমি অধিগ্রহণসহ বেশ কিছু কাজ আংশিক সম্পন্নও হয়। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ শুরু হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করে তৎকালীন সরকার। স্বাধীনতার পরে ফের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার। এরপর নানা সীমাবদ্ধতায় এর কাজ আর বেশি এগোয়নি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এলে গতি পায় প্রকল্পের কাজ। ২০০৯ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশে তখন ক্ষমতায় আসীন ইউনূস সরকার। এই বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সরকার ঢাক বাজিয়ে বলেছিল, এটা চালু হলে বিদ্যুৎ সংকট ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে। ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। তদারকি সরকার বিদায় নিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নতুন সরকারের কাছে গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প। তারেকের ক্ষমতায় আসা যখন প্রায় নিশ্চিত, সেই সময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছিলেন, জিয়াপুত্রকে পদে পদে বিপদে পড়তে হবে। কারণ, তদারকি সরকার তাদের দেড় বছরের শাসনামলে যে সব কীর্তি করে গিয়েছেন, তার ধাক্কা সহ্য করতে হবে তারেক সরকারকে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের পথ চলা শুরু হয়েছিল হাসিনার আমলে। প্রকল্পে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে রাশিয়ার রোসাটমকে। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চালু হবে প্রথম ইউনিট, উৎপাদন হবে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হবে ২০২৪ সালে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে ১২ শো মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট ২৪ শো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে দেশের জাতীয় গ্রিডে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বর্ধনশীল একটি দেশের ক্ষেত্রে এটা ছিল বিশাল অগ্রগতি। প্রকল্পের কাজ এখন নির্ধারিত সময়সূচি থেকে পিছিয়ে গিয়েছে আরও তিন বছরের বেশি। বেড়েছে খরচ। এর জন্য বাংলাদেশকে গুনতে হচ্ছে বিশাল অংকের অর্থ। রোসাটমকে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত সুদ। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও শুরু হয়নি। এই বিশাল পরিমাণ সুদের প্রভাব পড়ছে জাতীয় রাজনীতিতে। প্রশ্ন এই অনাকাঙ্খিত বিলম্বের জন্য দায়ী কে – রাশিয়া না কি বাংলাদেশ? যদি বাংলাদেশ দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে কোন সরকারকে এর জন্য কাঠগড়ায় তোলা উচিত?।
কাজ সময়মতো শেষ না হলে কেন বাংলাদেশকে এই অতিরিক্ত সুদের বোঝা বইতে হবে? প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। সরকারের তরফেও এখনও এই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছিল বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালু না হওয়ায় কেন্দ্র চালু করা যাচ্ছে। আবার কিছুদিন আগে শোনা গেল সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত। তারপরেও কেন প্রকল্প চালু করা যাচ্ছে না? সমস্যা কোথায়? ২০২৩ সালে হিসেব করা হয়েছিল প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে ছয় টাকা। তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮০ টাকা। ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ডলারের দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদের সম্ভাব্য খরচ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রাংশের একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। সেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা থাকবে না। ফলে, স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে রূপকথা হতে চলেছে।












Discussion about this post