প্রতিশ্রুতি, সে প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক হতে পারে, আবার সামাজিক প্রতিশ্রুতিও হতে পারে। তবে প্রতিশ্রুতি যে ধরনের হোক না কেন, সেটা দেওয়ার আগে একাধিকবার চিন্তা করা উচিত। তারেক রহমান তখনও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ইস্তেহার প্রকাশ উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারাপার্সন সহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ওই অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এই বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ক্ষমতায় গেলে তাঁর সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। প্রশ্ন উঠছে, তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জুলাই সনদ খুঁটিয়ে পড়ার পর ? না কি আবেগ তাড়িত হয়ে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কারণ, জুলাই সনদে বলা হয়েছে এক ব্যক্তি এক পদের কথা। যার অর্থ এক ব্যক্তি একাধিক সময় দুটি পদে থাকতে পারবেন না। তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপার্সন। আবার তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। একদিকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অপর দিকে জুলাই সনদকে মান্যতা দেওয়া। তারেক পড়েছেন উভয় সংকটে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বেশ কিছু আপত্তির কথা জানিয়েও সই করেছেন। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত, ২৪-য়ের গণ অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিবাদের কবল থেকে দেশ মুক্তি পেলেও সংবিধানে স্বৈরাচার সৃষ্টির পথ রয়েছে। তাই, আর কোনও স্বৈরাচার যাতে জনগণের ওপর চেপে না বসে, সেই জন্যই জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছে। আলী রিয়াজ কথা বলছিলেন সাংবাদিক সম্মেলনে। সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছিল গত ১ ফেব্রুয়ারি, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে। তাঁর দাবি ছিল এই সনদ অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা নয়। তবে এটি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অভিমুখ ঠিক করে দেবে। তাঁর কথায় গত তিনটি নির্বাচনে প্রহসন হয়েছে। নির্বাচনকে তিনি কোনও অবস্থাতেই নির্বাচন বলে মানতে নারাজ। একটি সম্ভাবনাময়, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আলী রিয়াজ বলেছিলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সময়ে যারা গুম, খুনের শিকার হয়েছেন, জুলাই বিপ্লবে যারা শহীদ হয়েছেন ও আহত হয়েছেন, তারা আমাদের একটি দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন। আমরা যেন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশটা এমনভাবে গড়ে তুলি যেন আর কোনও দিন কোনও ফ্যাসিবাদী শাসক তৈরি না হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই সনদের ওপর নেওয়া হয় গণভোট। “হ্যাঁ” – য়ের পক্ষে ভোট পড়েছে বেশি। ফলে, তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা পালন করার সময় এসেছে। কিন্তু ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি অনুসারে, দলের চেয়ারম্যান পদ তাকে ছাড়তে হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদ রক্ষা পাবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তাঁকে খুব একটা অসুবিধের মধ্যে পড়তে হবে না। দ্বিতীয় রাস্তাটি হল প্রধানমন্ত্রী পদের মায়া ত্যাগ করে শুধুমাত্র বিএনপি চেয়ারপার্সনের পদে থেকে যাওয়া। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যিনি হবে, তার ওপর দায়িত্ব বর্তাবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। জুলাই সনদ নিয়ে আলী রিয়াজদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই বর্তমান সংবিধানকে মুছে তাদের পছন্দের একটা বিকল্প সংবিধান তৈরি করা। তবে তারেকের সামনে রাস্তা কিন্তু এখনও খোলা আছে। সেই রাস্তা হল আইনে পধে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন বন্ধ করে দেওয়া। বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ হতে চলেছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। অর্থাৎ, যে কোনও প্রস্তাব সংসদে নিম্নকক্ষে পাশ হলেই হবে না, প্রস্তাবকে উচ্চকক্ষেও পাশ হতে হবে। জুলাই সনদকেও সংসদে পেশ করতে হবে। তবেই সেটা আইনি স্বীকৃতি পাবে। কোনওভাবে যদি ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেলে তা আর কার্যকর করার সংস্থান থাকবে না।












Discussion about this post