বাংলাদেশে সেই সময় ক্ষমতায় আসীন মুহাম্মদ ইউনূস। পদ্মাপারে চলছে মুষলপর্ব। মুষলপর্বের প্রথমদিকে দেশজুড়ে এতো নৈরাজ্য, যা দূর করতে মাঠে ছিল সেনাবাহিনী। ধাপে ধাপে পরে বাহিনী রাস্তা থেকে ব্যারাকে ফিরে যেতে শুরু করে। একসময় সেনাপ্রধান ওয়াকার জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর বাহিনী আর রাস্তায় থাকবে না। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরেই তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। এই প্রতিবেদন যেদিন লেখা হচ্ছে সেদিনের তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি। এখনও রাস্তায় রয়েছে সেনাবাহিনী। প্রশ্ন উঠছে সেনাবাহিনী কবে পুরোপুরি ব্যারাকে ফিরে যাবে? সামনেই ইদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ করছেন সেনা সদস্যরা। সেনাবাহিনীকে আর কতদিন এভাবে বাইরে রাখা হবে? কিছু উড়ো খবর শোনা যাচ্ছে। সেই সব উড়ো খবর হল সেনাপ্রধান ওয়াকার তাঁর বাহিনীকে পুরোপুরিভাবে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবেন।
বিগত সরকার প্রধানের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্ক যে আদায় কাঁচকলায় ছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। প্রফেসর ইউনূস সেনাবাহিনীর তিন শাখাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিগত সরকার প্রধান রোহিঙ্গাদের জন্য করিডোর তৈরি করার চেষ্টা চালান। সেনাপ্রধান ওয়াকার সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কোনওভাবেই এই করিডোর হতে দেবেন না। তিনি ওয়াকারকে আরও দুটি বার্তা দিয়েছিলেন। দুটি বার্তার একটি ছিল ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ভোট করাতে হবে। আর সেনার বিষয়ে ইউনূস যেন কোনওভাবেই হস্তক্ষেপ না করেন। রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ করিডোরে আপত্তি একা ওয়াকারের ছিল না। আপত্তি ছিল নৌসেনা এবং বায়ুসেনা প্রধানেরও। সেনাপ্রধান চেয়েছিলেন ২০২৬-য়ের প্রথম দিনটা যেন হয় নতুন সরকারের। নির্বাচন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ডিসেম্বর নয়, নির্বাচন হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে । অর্থাৎ, সেনাপ্রধান ওয়াকারের দেওয়া ডেটলাইনের প্রায় আড়াই মাস বাদে। সেনাপ্রধান চাইছিলেন তিনি তাঁর ইউনিটকে দ্রুত ব্যারাকে ফেরাতে। কিন্তু পূর্বতন সরকারের কিছুটা গয়ংগচ্ছ মনোভাবের জন্য সেটা সম্ভব হয়নি।
সেনাপ্রধান ওয়াকারের সঙ্গে পূর্বতন সরকারের সম্পর্ক কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল, সেটা বোঝা যাবে জেনারেল ওয়াকারের একটি বক্তব্যে। গত দেড় বছরে সেনাপ্রধানের অনেক বক্তব্য নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনা হয়েছে। ২০২৫-য়ের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। জেনারেল বলেন, মবের বিরুদ্ধে কোনও অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে না। উলটে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। মবকে একধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর কোনও মবকে রেহাই দেওয়া হবে না। কিন্তু তারপরেও বিদায়ী সরকারকে দেখা গিয়েছে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে। তার পরিণতিতে ডেইলি স্টার, প্রথম আলো-র মতো পত্রিকা দফতরে রীতিমতো নির্বিবাদে তাণ্ডব চলে। গোয়ালন্দে লাশ কবর থেকে তুলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীকে তার দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। সেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। সেনাবাহিনীকে নানাভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে। সেনাপ্রধানকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। ব্যারিস্টার ফুয়াদরা তো প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়ে বলেছিলেন তারা সেনানিবাস উড়িয়ে দেবেন। তারপরেও তাদের বিরুদ্ধে পূর্বতন সরকার প্রধান কোনও পদক্ষেপ করেনি। পদক্ষেপ করেনি ভারত-বিদ্বেষী নেতাদের বিরুদ্ধেও। ব্যারিস্টার ফুয়াদের এক ঘনিষ্ঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটার করা হয়েছে। আর তাঁর নির্দেশে বাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
সেই সেনাবাহিনীর এখন ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে গত দেড় বছরে যারা মববাজি করেছে, তারা কোনওভাবেই ক্ষমতায় আসতে পারেনি। মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ চেয়েছিল দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন, গণতন্ত্র। বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের মধ্যে দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে। সেনার এবার ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পালা।












Discussion about this post