বিএনপি ক্ষমতায় আসায় কার্যত কারাগারের জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। মুক্তি পেয়ে প্রাণভরে কথা বলেছে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। বলেছেন, এক সপ্তাহ ধরে ভালো আছেন। অর্থাৎ, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরের সাতদিনের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ইউনূস সরকারের সময় বিএনপি তাকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করেছে। প্রশ্ন হল, এই আওয়ামী লীগার রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করার জন্য কেন তৎপর ছিল বিএনপি? তাতে দলের কী লাভ হয়েছে?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রবল পরাক্রমশালী শেখ হাসিনা সরকারের তাসের ঘরের মতন পতন হল, তাতে যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অভাবনীয়। প্রশাসন থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট, পুলিশ, এমনকী মাঠ পর্যায় সর্বত্র পট পরিবর্তন ঘটে। সেই ঝড়ের রাতে প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এমনকী জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অজ্ঞাতস্থানে থেকে পদত্যাগ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।কিন্তু এই তুমুল ওলট পালটের মধ্যে প্রবল বিস্ময় হয়ে বঙ্গভবনে টিকে ছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হিসেবেই পরিচিত বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তী সরকারের আমলে তাকে অপসারণের নানা চেষ্টা, আলটিমেটামও দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেকথা নিজেও বলেছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল ও বঙ্গভবন অভিমুখে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে নানা কৌশলে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। বরং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্নে আমি অনড় ছিলাম।’ প্রয়োজনে বঙ্গভবনে নিজের রক্ত ঝরলেও সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাবেন না, এমন মনোভাবের কথাও জানান রাষ্ট্রপতি।
টিকে থাকার ফল হিসেবে তিনিই ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচিত সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করান। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর পতিত সরকারের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতির হাত দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের শপথ নেওয়া বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতিতে এক অনন্য নজির। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে তিনি টিকে গেলেন? কাদের শক্তিতে? এই রহস্যের জট মহম্মদ সাহাবুদ্দিন নিজেই খুলেছেন। রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, “আমি নির্দিধায় বলতে পারি ওই কঠিন সময়ে বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনও সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মধ্যে অনেক কৌতুহল জমা ছিল। কিন্তু পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম তিনি খুবই আন্তরিক মানুষ। হি ওয়াজ সো কার্ডিয়াল। আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল। ”
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতিকে যেভাবে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা চলে, সেই সময় বিএনপি জোট এবং সশস্ত্র বাহিনী পাহারাদারের ভূমিকায় উত্তীর্ণ নয়। ২০২৩য়ের এপ্রিলে দেশের ২২ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তাঁর আগে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এই খাঁটি আওয়ামী লীগারকে কেন বিএনপি পাহারা দিয়ে রক্ষা করল, সেই উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলিতে।
মূলত এটি ছিল বিএনপির সুদূর প্রসারী এক রাজনৈতিক দাবা খেলার চাল। আবেগ নয়, নিরেট রাজনৈতিক বাস্তবতা। এক নিখুঁত কৌশল। সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রথম বড়ো ধাক্কাটি আসে ২০২৪-য়ের ১৯ অক্টোবর। তিনি ঢাকার একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হঠাৎ করেই বলে বসেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে এর কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। একটি মন্তব্য বারুদরূপে দেশলাইয়ের মতো কাজ করে। অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। আসিফ নজরুল বলেন, হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মিথ্যাচার করেছেন। সেই ক্ষোভের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ এবং ছাত্র লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে গণজমায়েত হয়। সেই সময় সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পরিত্রাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি।












Discussion about this post