খুব বেশি দিনের কথা নয়। গত বছর ডিসেম্বরেও বাংলাদেশ থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছিল ভারত – বিদ্বেষী কথাবার্তা। শিলিগুড়ির চিকেন নেক কেটে নেওয়ার হুমকি। এ দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের বাংলাদেশে লালন পালন করে ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কাজে ব্যবহার করার হুমকি। সব কিছু এক লহমায় বদলে গেল। তারেক রহমান দেশে ফিরলেন। পদ্মাপারে নির্বাচন হল। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করল। জিয়াপুত্র প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হলেন। কোনও এক আশ্চর্য জাদুতে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অভিমুখ বদলে গেল। বলা হচ্ছে, এই পালাবদলের নেপথ্যে রয়েছে ভারত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, ঢাকার এই সব বাড়বাড়ন্ত সাউথব্লক মেনে নেবে না। সাউথব্লক দেখতে চেয়েছিল ঢাকার ক্ষমতা। তাদের ভারত-বিদ্বেষী সুর কত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। যেখানে তাদের থামিয়ে দেওয়ার দরকার মনে করবে সাউথব্লক, সেখানে তাদের থামিয়ে দেওয়া হবে। আর বাস্তবে সেটাই হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থা এখন এতটাই সঙ্গীন যে তাদের এখন ভারতের কাছে সাহায্য চাইতে হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে জ্বালানি তেলের সংকট গুরুতর আকার নিয়েছে বিশ্বে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তেল আমদানিতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে ভারতকেও। ভয়ংকর এই পরিস্থিতিতে তথৈবচ অবস্থা বাংলাদেশের। অভাব সত্ত্বেও গুরুতর এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ডিজেল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল ভারত। বিপদের বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টন ডিজেল দেবে ভারত। যার মধ্যে মঙ্গলবারই ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাঠানো হচ্ছে অসমের নুমালিগড় তেল সংশোধনাগার থেকে। পাইপলাইনের মাধ্যমে যাবে এই ডিজেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মহম্মদ রেজানুর রহমান এই খবরে সিলমোহর দিয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে যে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশের গায়েও সেই আঁত লাগছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বার্ষিক জ্বালানি সরবরাহের যে চুক্তি হয়েছে, তারই আওতায় বাংলাদেশকে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের উত্তরে, দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোয় অসম থেকে ডিজেল ঢুকছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদি এবং শেখ হাসিনা, তার মাধ্যমে পৌঁছচ্ছে ডিজেল। পাইপলাইন বসার আগে রেলপথেই জ্বালানি পৌঁছত। ভারতের কাছ থেকে জোগান মেলায়, আপাতত বাংলাদেশের চিন্তা খানিকটা কমল।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব গুরুতর আকার নিয়েছে বাংলাদেশে। তেল সংকটের মোকাবিলায় সে দেশে বাইকে ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার করে তেল দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বন্ধ করার পাশাপাশি আগাম ইদের ছুটি ঘোষণা হয়েছে। গ্যাসের কালোবাজারি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ২-৩ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে রান্নার গ্যাস। তেলের পাম্পগুলিতে দেখা গিয়েছে দীর্ঘ লাইন।
যুদ্ধের আবহে বাংলাদেশকে জ্বালানি জোগানোর এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বরাবর দুই দেশের মধ্য়ে সুসম্পর্ক থাকলেও, ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর তিক্ততা চরমে ওঠে। মহম্মদ ইউনূসের তদানীন্তন অন্তর্বর্তী সরকার দিল্লির সঙ্গে একাধিক বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি চুক্তি সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেয়। চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় সেই সময়। ঝাড়খণ্ডে আদানিগোষ্ঠীর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনাও কমিয়ে দেয় তারা। গ্যাস এবং এলএনজি সরবরাহও বিঘ্নিত হয়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং গ্যাসের ৭০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। চলমান যুদ্ধের ফলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, সংকটে কিছুটা স্বস্তি আনতে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ফার্নেস অয়েল, এলপিজি এবং কনডেনসেটবাহী ছয়টি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া এলএনজি, এলপিজি ও ডিজেলবাহী আরও পাঁচটি জাহাজ বর্তমানে বাংলাদেশের পথে রয়েছে বলে জানােনো হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।












Discussion about this post