আপনাদের নিশ্চই মনে আছে বাংলাদেশ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে গত ১৯শে জানুয়ারি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। রীতিমতো মাইকে ঘোষণা করে পুলিশ ও র্যাবের গাড়িতে হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছেই অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকা একটা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন নাম, তেমনই তার বাহার। জঙ্গল সলিমপুর যেন অপরাধী, সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য। সেখানে প্রশাসনের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, সত্যিই জঙ্গলরাজ চলছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ক্ষমতায় পালাবদল ঘটেছে। ভূমিধস জয় পেয়েছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমান। এবার জঙ্গল সলিমপুরে বড়সড় অভিযান চালালো বিএনপি সরকার।
জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে, লিংক রোডের উত্তর পাশে বিস্তৃত ৩,১০০ একর জায়গাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুর নামক এলাকাটি অবস্থিত। সরকারি খাস জমিতে পাহাড় কেটে এই এলাকায় বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। যা মূলত ‘সন্ত্রাসীদের’ কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছে। বলা হয় এখানে বাংলাদেশ পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেই। যার জলজ্যান্ত প্রমাণ ভোটের আগে জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। এবার বিএনপির সরকার এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ব্যাপক ধরণের অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু সূত্রের খবর, সেই খবর আগেই ফাঁস হয়েছিল, ফলে অভিযান খুব একটা সফল হয়নি। তবে বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরে এখন থেকে পুলিশ ও র্যাবের দুটি স্থায়ী কেন্দ্রের কার্যক্রম চলবে। তিনি আরও বলেন যদি প্রয়োজনে কামান দেওয়া লাগে, কামান দেব।
জানা যায় জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ২০-২৫ হাজার মানুষ বাস করলেও তাদের জন্য রয়েছে আলাদা পরিচয়পত্র। বিপুল সংখ্যক ছিন্নমূল মানুষের পাশাপাশি নিম্নআয়ের বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষরা এখানে বসবাস করেন। আর এই সুযোগেই এখানে অপরাধী, সমাজবিরোধী ও সন্ত্রাসীদের মুক্তাঞ্চল তৈরি হয়েছে। সোমবার সকাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযান শুরু হয়। র্যাবের গাড়ি বহরের সাথে একাধিক অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে দেখা গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। কিন্তু মূল এলাকায় ঢুকতে গিয়ে প্রতিপদে বাঁধা পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, ভেতরে ছোটো কালভার্ট ভেঙ্গে রাখার পাশাপাশি রাস্তায় ট্রাক আড়াআড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অনেক স্পিড ব্রেকার দিয়ে রাখা হয়েছে। সেই কারণেই মনে করা হচ্ছে এই অভিযানের আগাম খবর ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। তবে এদিন হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলেই জানা যায়, সেই সঙ্গে একাধিক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে বসানো হয় চেকপোস্ট। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সন্ত্রাসীদের হামলার উদাহরণ থাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে এই অভিযানে ওই এলাকায় সন্ত্রাসের জন্য যারা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছিল, তাদের কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা গেছে কি-না সে সম্পর্কে পুলিশের দিক থেকে কিছু জানানো হয়নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ১৫ থেকে ২০ জন দুষ্কৃতিকে আটক করা হয়েছে।
ডিআইজি আহসান হাবীব দাবি করেন, এই অভিযানে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের ৩ হাজার ২০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, আমাদের মূল ফোকাস ছিল এই বিশাল অংশে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং আমরা সেটি করতে পেরেছি৷ এবার থেকে পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প এখানে কাজ করবে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, পাহাড় কেটে কেটে তৈরি হওয়া এলাকাটিতে প্লট বাণিজ্য, অস্ত্র ও মাদক নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলে। ২০২৪ সালের অগাস্টে সরকার পরিবর্তনের পর দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে এবং ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তাতে একজনের মৃত্যু হয়, এবং চারজন অপহৃত হয়েছিলেন। পরে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। এই এলাকার ইতিহাস অতি নির্মম। তাই জঙ্গল সলিমপুরকে দেশের ভিতরেই একটি দেশ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এখানে আইনের শাসন নেই, প্রশাসনের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। আওয়ামী লীগ আমলে ২০২২ সালে একবার র্যাবের সাথে জঙ্গল সলিমপুরে ‘সন্ত্রাসীদের’ সংঘর্ষে গোলাগুলি চলেছিল। পরে এই এলাকায় প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলেও সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগের আমলে একাধিকবার চেষ্টা হয়েছিল জঙ্গল সলিমপুরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তা হয়নি। কারণ এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ কিংবা রিদোয়ান গ্রুপ। তাঁরাই এখানকার ছায়া প্রশাসক। এখন দেখার বিএনপি সরকার এই এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে কিনা। তবে অভিযানের আগেই যেভাবে তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে এর শিকড় অনেক গভীরে।












Discussion about this post