বাংলাদেশে ভূমিকম্প।
একে ভূমিকম্প ছাড়া আর কিই বা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদ্মাপারের একটি পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকার যেন এক প্রাসাদবন্দি রাষ্ট্রপতির রোমহর্ষক গল্প। টানা দেড় বছরের সেই বন্দিদশার অবসান। সাক্ষাৎকারটি দেন গত শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন “বঙ্গভবনে”। রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, পূর্বতন তদারকি সরকার তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নানা ধরনের ফন্দিফিকির করে। পাতা হয়েছিল ফাঁদ। তিনি সেই ফাঁদে পা দেননি। রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর ভাষ্যে- “ আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়। কোনও পরিস্থিতিতে আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝড়ে যাবে বঙ্গভবনে। রক্তে ঝড়ে ঝড়ুক। আরও একটি ইতিহাস যোগ হবে। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব – এই সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তা।”
২৪-য়ের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে প্রশ্ন করা হয়। জিজ্ঞাসা করা হয়, “কে বা কাদের নেতৃত্বে ওই আন্দোলন হয়েছিল? কেনই বা আপনার প্রতি এত আক্রোশ ছিল তাদের? ” জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ ২২ অক্টোবর ২০২৪, বঙ্গভবন ঘেরাও হলো। অমুকের দল, তমুকের দল, মঞ্চ, ঐক্য – কত কী! রাতারাতি সৃষ্টি! এগুলো একই টাইপের লোকজন সব বিভিন্ন ফোরামে, বিভিন্ন নামে। কোথায় তারা এত টাকা পেল? ”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিল। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হল, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে যে ছবি তোলো, ছবি তোলো। মানে এটা দিয়ে সে ব্ল্যাকমেইল করবে। তারপর তাকে মহিলা পুলিশ দিয়ে আর মহিলা আর্মি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে তুলে আর্মির জিপে করে নিয়ে যায়। ”
সাহাবুদ্দিন চুপ্পির কথায়, ওই রাতটা তাঁর জন্য ছিল বিভীষিকাময়। পত্রিকাকে তিনি বলেন, “ওই দিন রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গিয়েছে। ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি। তারপর দেখি, কিছু স্থানীয় লোক এসে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়। তাদের সরাতে রাত ২টা বেজেছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত আমরা তো জেগে আছি। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় তারা মিটিং করছে- রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই, রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই।”
পত্রিকার তরফ থেকে প্রশ্ন করা হয়, সেই দুঃসময়ে তিনি কাউকে পাশে পেয়েছিলেন কি না? জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”
পত্রিকার প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে রাষ্ট্রপতি অপসারণের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছিল, আর কারা এর ইন্ধন জুগিয়েছিল বলে তিনি মনে করেন? জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “মূলত গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও একটা সিদ্ধান্তে এসেছিল। সেটা হল, যদি রাজনৈতিক দলগুলো চায় আমি অপসারিত হই, তাহলেই শুধু আমি অপসারিত হতে পারি; না হলে নয়। তখন এ রকম একটা অবস্থা ছিল যেকোনো মুহূর্তে মেজরিটি হয়ে গেলেই আমি অপসারিত হয়ে যাব বা আমার মনস্তাত্ত্বিক দিক ভেঙে যাবে। তখন তারা আমাকে অনুরোধ করবে পদত্যাগের জন্য। ”
সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “বিএনপি থেকে উচ্চপদে আসীন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, আমার প্রতি তাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই। আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।”












Discussion about this post